শামসুজ্জামান দুদুকে কৃষি মন্ত্রি দাবি দাবির পেছনে আছে যুক্তি, ইতিহাস ও একটি অঞ্চলের দীর্ঘশ্বাস
রাজনীতি কখনো শুধু ক্ষমতার খেলা নয়। কখনো কখনো রাজনীতি হয়ে ওঠে স্মৃতি, সংগ্রাম আর দায়বদ্ধতার নাম। তখন একটি পদ মানে শুধু চেয়ার নয়—তা হয়ে ওঠে একটি বার্তা। আজ ঠিক সেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে শামসুজ্জামান দুদু–কে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার দাবি। এটি চুয়াডাঙ্গা -কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ-মেহেরপুরবাসীর অন্তরের দাবি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বৃহত্তর এই অঞ্চলে বিএনপির ভরাডুবিতে হতাশাগ্রস্থ মানুষ আরও প্রবলভাবে এই দাবি উচ্চকিত করে তুলেছে। এটি পূরণ হলে নির্বাচন্র পরা
এই দাবি হঠাৎ জন্ম নেয়নি। এর পেছনে আছে সময়ের অভিজ্ঞতা, রাজনীতির কঠিন অধ্যায় আর চিরবঞ্চিত একটি জনপদের মানুষের দীর্ঘ বছরের প্রত্যাশা।
দুদুর রাজনৈতিক উত্থানপর্ব শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র হিসেবে। ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে তিনি শিখেছিলেন সংগঠন কীভাবে গড়ে তুলতে হয়, মতভিন্নতার ভেতর শৃঙ্খলা কীভাবে রক্ষা করে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হয়। পরে কৃষকদলের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি হয়ে তিনি রাজনীতিকে নামিয়ে আনেন মাঠে—মাটির কাছাকাছি। সেখানে বক্তৃতার চেয়ে বেশি ছিল শোনা, প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি ছিল বোঝা। কৃষক তাঁর কাছে কোনো ভোটের অঙ্ক ছিল না, ছিল জীবনের শুদ্ধতম অংশ।
তিনি ইতোপূর্বে সংসদ সদস্য ছিলেন। নষ্টদের ভিড়ে, সংসদের আলো-বাতাস দেখেও তাঁর নামের পাশে দুর্নীতির কোনো দাগ লাগেনি। আজকের বাস্তবতায় এটি শুধু ব্যক্তিগত সততা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক সম্পদ। কারণ মানুষ এখন বক্তৃতা নয়, বিশ্বাসযোগ্য মানুষ খোঁজে।
চুয়াডাঙ্গা জেলার সবচে' জনপ্রিয় প্রবীণ নেতা শহিদুল কাউনাইন টিলু বলেন,
“দুদু সাহেব ক্ষমতায় ছিলেন, আবার ক্ষমতার বাইরে থেকেও লড়েছেন। এই দুই অভিজ্ঞতা একসাথে খুব কম নেতার আছে। তিনি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা হিসেবে ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে রাজপথে ছিলেন প্রখরভাবে, টকশোতে ছিলেন অনন্য প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। খেটেছেন বেশ কয়েকবার জেল। এবার নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ মন্ত্রিত্ব দেওয়া উচিত। দেশনায়ক তারেক রহমানের নিকট সেই দাবিই করছি।"
এই দাবির প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো—কৃষি বিষয়ে তাঁর বাস্তব সংযোগ। তিনি কৃষি নিয়ে কথা বলেছেন মঞ্চে দাঁড়িয়ে নয়, মাঠে বসে। কৃষকের ভাষা তাঁর অচেনা নয়। নীতিনির্ধারণের টেবিলে বসলে এই অভিজ্ঞতাই কাগুজে সিদ্ধান্তকে মানবিক করে তুলবে।
আলমডাঙ্গার কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,
“দুদু ভাই জাতীয় রাজনীতিতে যৌক্তিক বক্তা। একই সাথে মানুষের সমস্যার কথা বললে মনে হয় তিনি আমাদেরই একজন। তিনি কৃষির দায়িত্বে গেলে কৃষক উপেক্ষিত থাকবে না।”
দ্বিতীয় যুক্তি আসে অঞ্চলভিত্তিক রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে। চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহ—এই বৃহৎ জনপদে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির ফল আশানুরূপ হয়নি। এর পেছনে শুধু ভোটের অঙ্ক নয়, আছে সাংগঠনিক ক্লান্তি, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্বের দূরত্ব।
এই অঞ্চলে এমন একজন নেতাকে সামনে আনা জরুরি, যিনি বিতর্কমুক্ত, গ্রহণযোগ্য এবং দলীয় শৃঙ্খলা বোঝেন। দুদু সেই বিরল নাম, যিনি বিরোধ তৈরি না করে ঐক্যের ভাষা বলতে পারেন। একই সুতোয় গণমানুষের এই দলকে বাধতে পারবেন।
আলমডাঙ্গা সরকারি কলেজের শিক্ষক তাপস রশিদ বলেন,
“রাজনীতিতে কখনো কখনো প্রতীকী সিদ্ধান্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়। দুদু সাহেবকে দায়িত্ব দিলে এই অঞ্চলে নতুন করে আস্থা ফিরতে পারে।”
তৃতীয় যুক্তি হলো—দলের ভেতরের ভারসাম্য। দুদু আপোষহীন নেত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি না ছিলেন সুবিধাবাদী, না ছিলেন উসকানিমূলক। এই সংযত, দৃঢ়তা ও অভিভাবকসুলভ মানসিকতা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
আলমডাঙ্গা নাগরিক উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন,
“নৈতিকতার প্রশ্নে দুদু সাহেব কখনো ছাড় দেননি। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এমন মানুষ দরকার।”
সবশেষে আসে রাজনৈতিক বার্তার প্রশ্ন। কৃষি মন্ত্রণালয়ে শামসুজ্জামান দুদুকে দায়িত্ব দেওয়া মানে হবে—অভিজ্ঞতা, সততা ও মাঠের রাজনীতিকে মূল্য দেওয়া। এটি শুধু একজন নেতাকে এগিয়ে আনা নয়; এটি হবে কৃষক, সংগঠন ও একটি অবহেলিত অঞ্চলের প্রতি আস্থার মূল্যায়ন। তাদের দাবির প্রতি সঙ্গতি বিধান করা।
এটি একটি অবহেলিত অঞ্চলের দিকে ফিরে তাকানোর ইঙ্গিত।
এটি রাজনীতিতে বিশ্বাসযোগ্যতাকে আবার গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা।
এই বাস্তবতা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছেও অজানা নয়। তারেক রহমান যদি এই দাবি বিবেচনায় নেন, তবে সেটি হবে আবেগ নয়—রাজনৈতিক দূরদর্শিতা প্রসূত সিদ্ধান্ত।
কারণ কিছু সিদ্ধান্ত সময়ের চাহিদা মেটায়, আর কিছু সিদ্ধান্ত ইতিহাসের ভাষ্য হয়ে থাকে।
দুদুকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে আনার দাবি—আজ ঠিক সেই ইতিহাসের দিকেই ইঙ্গিত করছে।
কিছু দাবি স্লোগান হয়ে বুঁদবুঁদের মত মিলিয়ে যায়,
আর কিছু দাবি সময়ের হয়ে কথা বলে যায়।
দুদুকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে আনার দাবি—আজ ঠিক তেমনই একটি সময়ের ভাষ্য।