অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে জামায়াতের ভূমিধ্বস জয়ের নেপথ্য দশ কারণ
চুয়াডাঙ্গা–১ আসনে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিশাল জয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, সুক্ষ্ম ভোটের অঙ্ক এবং প্রতিপক্ষের সাংগঠনিক দুর্বলতার এক অনিবার্য ফল। এই বিজয়ের পেছনে যে ১০টি বাস্তব কারণ কাজ করেছে, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. তারুণ্যের ভোটব্যাংক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন
এই নির্বাচনের প্রধান টার্নিং পয়েন্ট ছিল তরুণ ভোটাররা। নতুন ভোটার, বেকার যুবক এবং মাদ্রাসা ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি বিশাল অংশ জামায়াতকে বেছে নিয়েছে। গত ১৭ বছর যারা ভোট দিতে পারেনি, তারা পুরোনো রাজনৈতিক ভাষা শুনে ক্লান্ত। এই প্রজন্ম শহিদ জিয়া বা খালেদা জিয়ার রাজনীতির সাথে সরাসরি পরিচিত নয়, দেখেনি মুক্তিযুদ্ধও। তাদের কাছে জাতীয়তাবাদী দর্শন স্পষ্ট করার মতো দক্ষ নেতৃত্ব প্রতিপক্ষ শিবিরে ছিল না। এমনকি তারেক রহমানের '৩১ দফা' সম্পর্কেও স্থানীয় অনেক নেতা অজ্ঞ ছিলেন। ৫ আগস্টের পর স্থানীয় অযোগ্য নেতৃত্বের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড তরুণদের বিমুখ করেছে, যার ফলে তারা বিকল্প হিসেবে জামায়াতকে গ্রহণ করেছে।
২. নারীদের নীরব বিপ্লব
নারীদের ভোট ছিল এই নির্বাচনের তুরুপের তাস। চুয়াডাঙ্গা–১ আসনে জামায়াতের নারী কর্মীরা বছরের পর বছর ধরে অন্দরমহলে কাজ করেছেন। নিয়মিত বৈঠক, সামাজিক যোগাযোগ ও বিশ্বাসের বন্ধন এতটাই দৃঢ় ছিল যে, অনেক বিএনপি নেতার পরিবারের নারীরাও জামায়াতকে ভোট দিয়েছেন। পুরুষদের রাজনীতি যখন জনসভায় সীমাবদ্ধ ছিল, নারীদের রাজনীতি তখন ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল। ভোটের দিন সেই নীরব সিদ্ধান্তের প্রতিফলনই ব্যালটে দেখা গেছে।
৩. ধারাবাহিক গণসংযোগ বনাম মৌসুমি রাজনীতি
জামায়াত এই আসনে কেবল নির্বাচনের সময় হাজির হয়নি। তারা দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের সুখ-দুঃখ, জানাজা ও পারিবারিক সংকটে পাশে ছিল। যেখানে প্রতিপক্ষ প্রার্থীরা অর্ধেক ভোটারের কাছেও পৌঁছাতে পারেননি, সেখানে জামায়াত প্রার্থী গড়ে প্রত্যেক ভোটারের সাথে ৬-৭ বার যোগাযোগ করেছেন। নির্বাচনের আগে প্রতীক বরাদ্দের পর প্রতিপক্ষ যখন অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটাতে ব্যস্ত, জামায়াত তখন মানুষের ঘরে ঘরে অবস্থান মজবুত করেছে।
৪. প্রতিপক্ষের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভাজন
বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে বাইরে ঐক্যের সুর থাকলেও ভেতরে ছিল গভীর অবিশ্বাস। এক নেতা অন্যকে সহ্য করতে পারেননি, যার ফলে কর্মীরা ছিল দিশেহারা। দলের দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে অনেক ত্যাগী নেতা জামায়াতের সাথে গোপনে বা প্রকাশ্যে হাত মিলিয়েছেন। অনেক জায়গায় ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা জামায়াতের জয়ের পথকে আরও সুগম করেছে।
৫. প্রতিপক্ষ নেতার নেতিবাচক ইমেজ
৫ আগস্টের পর থেকে স্থানীয় কিছু নেতার অনৈতিক ও স্বার্থান্বেষী কর্মকাণ্ড সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তীব্র ঘৃণা তৈরি করে। যারা মানুষের পাশে থাকার কথা ছিল, তারা যখন নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন ভোটাররা বিকল্প খুঁজতে শুরু করে। এই ক্ষোভ শুধু সাধারণ মানুষের নয়, দলের ভেতরকার বঞ্চিত ও অপমানিত নেতাকর্মীদেরও ছিল, যা শেষ পর্যন্ত জামায়াতের ভোটব্যাংকে যুক্ত হয়েছে।
৬. ডিজিটাল ও সোশ্যাল মিডিয়ার কার্যকর ব্যবহার
জামায়াত কেবল মাঠেই নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। নিজস্ব সংবাদকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে তারা প্রতিটি প্রচারণার 'টোন' এবং কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ করেছে। স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে সমন্বয় এবং বিশেষ বিশেষ গ্রুপে শেয়ারযোগ্য কন্টেন্ট তৈরির মাধ্যমে তারা তরুণ প্রজন্মের মগজধোলাই ও রাজনৈতিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।
৭. সুশৃঙ্খল তৃণমূল সাংগঠনিক ভিত্তি
তৃণমূল পর্যায়ে জামায়াতের শৃঙ্খলা ছিল সামরিক বাহিনীর মতো। ভোটের দিন কে কখন কেন্দ্রে যাবে, কাকে নিয়ে আসবে—সবই আগে থেকে ছক কাকা ছিল। ফজরের নামাজের পর সাতসকালে কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার যে শৃঙ্খলা তারা দেখিয়েছে, তা ফলাফলকে একপেশে করতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
৮. বিকল্প ও প্রতিবাদী শক্তি হিসেবে উত্থান
অনেক ভোটারের কাছে জামায়াত ছিল একটি 'প্রতিবাদী শক্তি'। যারা প্রতিপক্ষের অপকর্মে অতিষ্ঠ ছিলেন, তারা জামায়াতকে একটি বিকল্প ও সুশৃঙ্খল দল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে কথা ও কাজে মিল রাখার ভাবমূর্তি তরুণদের আকৃষ্ট করেছে।
৯. ধর্মীয় মূল্যবোধ, শিক্ষা ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি
চুয়াডাঙ্গা–১ আসনের ভোটাররা প্রার্থীর নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত চরিত্রের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। জামায়াত প্রার্থীর সৎ ও শিক্ষিত ইমেজ এবং তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তিগত অভিযোগ না থাকাটা বড় প্লাস পয়েন্ট ছিল। এছাড়া গ্রামবাংলার মানুষের কাছে প্রার্থীর মার্জিত ও সুন্দর চেহারা বিশ্বাসের একটি প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে, যা তাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
১০. দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী
গত দুই বছর ধরে প্রতিটি ওয়ার্ড ও গ্রামে শিক্ষিত কর্মীদের মাধ্যমে জামায়াত ভোটযুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের স্থানীয় সমস্যা ও মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার সক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনের সময় প্রার্থীর সাথে থাকা একঝাঁক শিক্ষিত ও স্মার্ট যুবক (যেমন: নূর মোহাম্মদ হুসাইন টিপু, দারুস সালাম, ইবনে কাইয়ুম হিরক, প্রভাষক শফিউল আলম বকুল, প্রভাষক ড. আব্দুর রহমান, শরিফুল ইসলাম পিন্টু ও আব্বাস উদ্দিন, আলমডাঙ্গা পৌর আমির মাহের আলী, উপজেলা সেক্রেটারি মামুন রেজা, পৌর সেক্রেটারি মুসলিম উদ্দিন, উপজেলা সহকারী সেক্রেটারি তরিকুল ইসলাম) তাদের রাজনৈতিক 'ক্ষেপণাস্ত্র' হিসেবে কাজ করেছেন।
চুয়াডাঙ্গা–১ আসনের এই জয় কোনো আবেগি ঢেউ নয়, বরং এটি ছিল নিখুঁত রাজনৈতিক অঙ্ক। তারুণ্যের শক্তি, নারীদের সমর্থন, দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের কাজ এবং প্রতিপক্ষের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই জামায়াতে ইসলামী এই অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
আলমডাঙ্গা-হাটবোয়ালিয়া সড়কের আলোচিত বৈদ্যনাথপুর মাঠে পণ্য ডেলিভারি ম্যানকে থামিয়ে টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ: ডেলিভারি ম্যান রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ
৪ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গার কেশবপুরে সাবেক সেনা সদস্য ও বিএনপি নেতার বাড়িতে হামলা-লুটপাট, আটক ১
১৯ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গার ডাউকি গ্রামে পান বোরজে অগ্নিকাণ্ড: ৫ কৃষকের স্বপ্ন পুড়ে ছাই, ক্ষতি প্রায় ২০ লাখ টাকা
২০ ঘন্টা আগে