ঋতুরাজ বসন্তের আবাহন বাসন্তী রঙে রঙিন বাঙালির পহেলা ফাল্গুন
শীতের রুক্ষতা বিদায় নিয়ে প্রকৃতিতে আজ লেগেছে নতুনত্বের ছোঁয়া। গাছের ডালে ডালে নতুন কুঁড়ি, শিমুল-পলাশের রক্তিম আভা আর কোকিলের কুহুতান জানান দিচ্ছে—আজ পহেলা ফাল্গুন। ঋতুরাজ বসন্তের এই আগমনে বাঙালির হৃদয়ে বেজে উঠেছে মিলনের সুর। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সেই কালজয়ী পঙ্ক্তি যেন আজ প্রতিটি বাঙালির মনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে:
“ফুল ফুটুক না ফুটুক / আজ বসন্ত।”
সংস্কৃতিতে বসন্তের অবস্থান ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে পহেলা ফাল্গুন কেবল একটি তিথি নয়, এটি একটি উৎসবের নাম। আবহমান কাল থেকেই বাংলার লোকগাঁথা, গান ও সাহিত্যে বসন্তের প্রভাব অপরিসীম। বিশেষ করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রক্তঝরা ইতিহাস এই ঋতুর সাথে মিশে আছে একাকার হয়ে। সেই অমর একুশে ফেব্রুয়ারির শোক ও শক্তির সাথে ফাল্গুনের এই বসন্তকাল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বসন্তের এই উন্মাদনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবে:
“এল রে এল রে এল রে বসন্ত / করিছে কুহুরব কোকিল অশান্ত।”
বসন্তের এই প্রাণশক্তি বাঙালিকে যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং নতুনের আহবানে জেগে উঠতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
উৎসবের আমেজ ও জনজীবন আজ ভোর থেকেই রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে টেকনাফ-তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রতিটি জনপদ সেজেছে বাসন্তী সাজে। তরুণীদের পরনে হলুদ ও লাল পাড়ের শাড়ি, মাথায় ফুলের মুকুট এবং তরুণদের পরনে বর্ণিল পাঞ্জাবি উৎসবের রঙকে আরও গাঢ় করে তুলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, রমনার বটমূল এবং টিএসসির প্রতিটি কোণ আজ জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই চিরচেনা গান যেন আজ প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠেই ফিরছে:
“আজি দখিন-দুয়ার খোলা— / এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো।”
কেবল উৎসবের সাজসজ্জাতেই নয়, বসন্তের প্রভাব পড়েছে বাঙালির রসুইঘরেও। বিভিন্ন পিঠা-পুলির ঘ্রাণে মুখর হয়ে উঠেছে গ্রামবাংলার আঙিনা। নাগরিক ব্যস্ততা ভুলে মানুষ আজ খুঁজে ফিরছে তার শেকড়ের ঘ্রাণ।
বাঙালি মানসে বসন্তের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব শীতের স্থবিরতা ভেঙে বসন্ত মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। এটি কেবল প্রকৃতির পরিবর্তন নয়, বরং মানুষের চিন্তা ও ভাবনার নবায়ন। কবি নির্মলেন্দু গুণ যেমনটা বলেছেন:
“হয়তো ফুটেনি ফুল শিমুলের ডালে, / হয়তো গাহেনি পাখি কান্তার-দেয়ালে, / তবুও এসেছে বসন্ত।”
এই বিশ্বাসই বাঙালিকে বারবার প্রতিকূলতা জয় করতে শেখায়। আধুনিক সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ যেমনটা বলেছিলেন, ফাল্গুনের এই দিনে আনন্দটুকুই যেন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর সেই দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়েই যেন আজকের এই উৎসবমুখরতা।
উপসংহার পহেলা ফাল্গুন আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই উৎসব আমাদের ঐক্যবদ্ধ করে। প্রকৃতির এই বিবর্তন আর বসন্তের এই সজীবতা বাঙালির জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল শান্তি ও সমৃদ্ধি। ঋতুরাজের এই বন্দনা কেবল একদিনের জন্য নয়, বরং সারাবছর যেন বাঙালির হৃদয়ে এই বসন্তের সজীবতা অটুট থাকে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়:
“বসন্ত এসেছে গো, এল বসন্ত— / সুগন্ধি কুসুম-ধনু নিয়ে এল অনন্ত।”
ফাল্গুনের এই মোহময় আবহে বাঙালির জয়যাত্রা চলুক নিরন্তর। শুভ পহেলা ফাল্গুন!