আমার পিতা মাওলানা আরশাদুল আলম (রাহ.) -মোহা ওয়ালিউর রহমান
আমার পিতা আল্লাহর বান্দা মাওলানা আরশাদুল আলম (রাহ.) নানা কুসংস্কারে নিমজ্জিত এবং ইসলামি আলো স্বল্পতায় ভোগা এক নিভৃত পল্লিতে জন্ম গ্রহন করেন। তিনি শিশুকালে একই দিনে পিতা-মাতাকে হারিয়ে এতিম হয়ে যান। জীবন সংগ্রামে নেমে পড়েন এই এতিম শিশু। গরু চরানো, কৃষি কাজে সহায়তা, পরিবারের নানাবিধ ফরমায়েশ প্রতিপালন ইত্যাদি কাজ তাঁর জীবন যাপনের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। তবে এই শিশুর জন্য বিশ্ব দরবার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন বিশ্বজগতের মালিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।
হিতৈষী মুরব্বিগণ তাঁর মেধা ও আন্তরিকতা বিবেচনা করে ভারতের কোলকাতার এক এতিমখানায় ভর্তি করে দেন। পরবর্তীতে তিনি খুলনায় হাতেম মোহাম্মদ সাহেবের মাদরাসায় অধ্যয়নকালে তাঁর মেধা, সততা এবং কর্মের প্রতি আন্তরিকতা দেখে ভারতের দিল্লির আজমিরি দরওয়াজায় অবস্থিত 'মাদরাসাতুর রশীদিয়া'তে লেখাপড়ার জন্য পাঠিয়ে দেন। সেখান থেকে তিনি সাফল্যের সাথে দরসে নিযামি পাঠ্যসূচি মোতাবেক ২৭শাওয়াল, ১৩৬৫ হিজরি মোতাবেক ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে অধ্যয়ন শেষ করেন এবং ১৯৪৭/৪৮ খ্রিষ্টাব্দে নিজ এলাকায় আসেন। দেশে ফিরেই তিনি আল্লাহর দীনের খেদমত এবং কুরআন-সুন্নাহর দাওয়াত সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দেওয়ার কাজে তৎপর হয়ে ওঠেন।
আমাদের পিতার জীবিত সাত সন্তানের মধ্যে আমি কনিষ্ঠ। কিশোর বেলায় আব্বার সাথে অনেক মধুর সময় কেটেছে আমার। আমাদের গ্রামের সন্নিকটে খাসকররার সাপ্তাহিক হাটে যেতাম আব্বার সাথে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সাথে আব্বার ছিল হৃদয়ের আন্তরিকতা এবং শ্রদ্ধা।
আমি আব্বাকে কোনো দিন চিৎকার করে কথা বলতে শুনিনি বা আমাকে ধমক দিয়ে কিছু বলেননি বা প্রহার করেননি। এটি আমার পিতার অনুকরণযোগ্য আদর্শ ও শ্রেষ্ঠ গুণাবলির অন্যতম। এ আদর্শ অনুকরণে আমি আমার সন্তানদের কখনো প্রহার করিনি। এছাড়া আমার আব্বা-মাকে কখনো ঝগড়া করতে দেখিনি। যদিও আমার মা ছিলেন নিরক্ষর এবং অতি সাধারণ, কিন্তু জগতভরা মমতাময়ী এক জননী। তিনিও আমাকে কোনোদিন প্রহার করেছেন বলে মনে পড়ে না। তাঁর মমতা আর স্নেহ ছিল বিশ্বজগতের মতো বিশাল। হে স্রষ্টা, আজিজুল গাফুর, জগতসমূহের শ্রেষ্ঠতম মমতাময়ী, তুমি আমাদের পিতা-মাতাকে তোমার রহমতের চাদরে জড়িয়ে চির শান্তির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করো।
আমার আব্বা চেয়েছিলেন আমিও তাঁর মতো আলিম হই। তিনি আমাকে সে লক্ষ্যে ঝিনাইদহ সিদ্দিকিয়া আলিয়া মাদরাসায় দাখিল আওয়াল ক্লাশে ভর্তি করিয়ে দেন। সেখানে আমি এক বছর লেখাপড়া করি। মাওলানা আবুল কাসেম (রাহ.) ও ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাহ.) আমার সহপাঠী ছিলেন। দাখিল আওয়াল ক্লাশের বার্ষিক পরীক্ষায় বর্ণিত দুইজন আলিম যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় এবং আমি তৃতীয় হয়েছিলাম। কিন্তু আব্বার মৃত্যু এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে আমার ইসলামি জ্ঞানসমৃদ্ধ আলিম হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
ইসলামি শিক্ষা বিস্তারে আমার আব্বা ছিলেন উচ্চাভিলাষী। তিনি কাবিলনগর মাদরাসা স্থাপনের ক্ষেত্রে উদ্যোগী হন এবং এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ওই মাদরাসা স্থাপন করেন। সেজন্য তাঁকে মিথ্যা মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে হেনস্তাও করা হয়।
তাঁর স্বপ্ন ছিল নিজ গ্রামে একটি মাদরাসা স্থাপনের। তখন সে পরিবেশ না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। মহান আল্লাহ তাঁর সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন। আজ আমাদের গ্রামে নওলামারি ফাজিল মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর আমাকে তিনি সেই মাদরাসার প্রথম ভবন নির্মাণ এবং এমপিও-ভুক্তিতে অবদান রাখার খোশ নসিব করেছেন। সেখানে এলাকার সকলের সহযোগিতায় আমাদের এতিম পিতা মাওলানা আরশাদুল আলমের নামে এতিমখানা এবং লিল্লাহ বোর্ডিং স্থাপিত হয়েছে। স্থাপিত হয়েছে হিফযখানা। যেখানে অসংখ্য এতিম আবাসন এবং অধ্যয়নের সুযোগ পাচ্ছে।
মাওলানা আরশাদুল আলম ইসলামের প্রচার এবং মুসলিমদের জীবনের সকল পর্যায়ে দীন ইসলাম অনুসরণের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তাঁর নিজ বাড়িসহ এলাকায় ইসলামি জলসার মাধ্যমে তিনি ইসলাম প্রচার করেছেন আজীবন। এ লক্ষ্যে তিনি জনকল্যাণকর কাজে সর্বদা উদ্যোগী থাকতেন।
তিনি একবার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সে সময় তিনি তাঁর সাধ্যমতো এলাকার রাস্তাঘাটসহ নানাবিধ উন্নয়নমূলক কাজ করেন। মহান আল্লাহর দীনকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রাদেশিক সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।
যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছেন। আমার পিতাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি ছিলেন মাটির একটি ঘর আর সামান্য জমি নিয়ে খেয়ে-না-খেয়ে জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত এক সৎ মহান কর্মবীর
আমাদের পিতা মাওলানা আরশাদুল আলম ০২ ভাদ্র, ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ, ১৮ আগস্ট, ১৯৭১ খিষ্টাব্দ রাত্রে ইশার নামাজান্তে অসুস্থতা অনুভব করতে থাকেন। আমাদের এবং প্রতিবেশীদের ডেকে ক্ষমা ও দুআ প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহর দীনের ওপর ও সৎ পথে থাকার ওসিয়ত করেন। আমাদের ছোট বোন আকলিমা খাতুন এবং আমাকে দেখে রাখার জন্য মেজো ভাই জনাব মাহবুবুর রহমানকে দায়িত্ব দেন। উল্লেখ্য আমাদের বড় ভাই মরহুম হাবিবুর রহমান তখন গ্রামের বাইরে ছিলেন। আল্লাহর রহমতে মেজো ভাই সকল নিষ্ঠা এবং ভালোবাসা দিয়ে তাঁর সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। এরপর, কিছুক্ষণের মধ্যে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে এতিম এবং জীবন সংগ্রামের এই মহান সাধকের রূহ মোবারক বের হয়ে যায় (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
লেখক: মরহুম মাওলানা আরশাদুল আলমের কনিষ্ঠ সন্তান, যুগ্মসচিব (অব.), গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।