আলমডাঙ্গায় মাঠ দিবস ও কারিগরি আলোচনা অনুষ্ঠিত ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে তেলজাতীয় ফসল আবাদ বাড়াতে হবে – ইউএনও
দেশের ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে তেলজাতীয় ফসলের আবাদ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পান্না আক্তার। তিনি বলেন, তেলবীজ চাষে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি দেশের অর্থনীতির ওপর চাপও কমবে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে আলমডাঙ্গা উপজেলার মাজু ব্লকের মাধবপুর মাঠ এলাকায় মাঠ দিবস ও কারিগরি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
দিগন্ত বিস্তৃত হলুদ সরষে ক্ষেতের মনোমুগ্ধকর পরিবেশে এ মাঠ দিবসের আয়োজন করা হয়। সরষের হলুদ রঙে মোড়া মাঠ যেন কৃষকদের সামনে সম্ভাবনার নতুন বার্তা তুলে ধরে। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আলমডাঙ্গা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এতে সভাপতিত্ব করেন ইউএনও পান্না আক্তার।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে ইউএনও বলেন, “কৃষক সব সময় লাভের হিসাব করেন। তাকে বোঝাতে হবে যে ধান বা প্রচলিত ফসলের মতো তেলবীজ চাষেও ভালো লাভ রয়েছে। তেলবীজের বাজার নিশ্চিত করতে পারলে কৃষকের আগ্রহ আরও বাড়বে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতি বছর ভোজ্যতেল আমদানিতে আমাদের প্রায় আড়াই বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা। তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়ালে এই ব্যয় কমানো সম্ভব। তাই ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে আমদানি নির্ভরতা কমাতে তেলজাতীয় ফসল আবাদ বাড়াতে হবে।”
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন চুয়াডাঙ্গা বীজ প্রত্যয়ন অফিসার কৃষিবিদ নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, “দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। দেশে উৎপাদিত তেলের মধ্যে সরষা শীর্ষে রয়েছে। বোরো ও আমন চাষের মাঝের সময়ে দেশের অনেক জমি পতিত থাকে। এই জমি ব্যবহার করে তেলবীজ উৎপাদন বাড়াতে সরকার রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করছে।”
তিনি বলেন, “এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরষাসহ বিভিন্ন তেলজাতীয় ফসলের আবাদ বাড়ানো হচ্ছে। এর সুফল ইতোমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। এ বছর সারা দেশে সরষার চাষ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উচ্চ ফলনশীল ‘বিনা সরিষা-১১’ এবং ‘বারি সরিষা-১৪, ১৭ ও ২০’ সম্প্রসারণ করা গেলে আমদানি নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।”
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা উদয় রহমানের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের অফিসার কৃষিবিদ হাসান আলী এবং আলমডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশ।
বক্তব্যে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশ বলেন,
“ভোজ্যতেল আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, যা আমাদের রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কৃষককে সচেতন করতে পারলে দেশীয় জাতের সরষা ব্যবহার করেই তেলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, “স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন বারি-১৪ ও বিনা সরিষা-১১ হেক্টরপ্রতি ২ টনের বেশি ফলন দেয়। সরষা কাটার পর একই জমিতে বোরো ধান চাষ করা যায়। ফলে দুই ফসলি জমিতে বছরে তিনটি ফসল পাওয়া সম্ভব।”
তিনি জানান, “চলতি মৌসুমে আলমডাঙ্গায় সরষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৪ শ'৫ হেক্টর। কিন্তু কৃষকদের আগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে অর্জিত হয়েছে ২ হাজার ৫ শ'৪৩ হেক্টর জমি।”
অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ অফিসার খবিরুল ইসলাম, আব্দুর রফিক, জাহিদুল ইসলাম, মেহেদী হাসান, দুলারী খাতুনসহ স্থানীয় প্রায় ৭০ জন কৃষক-কৃষাণী, গণমাধ্যমকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় একজন সরষে চাষিকে তেলবীজ থেকে তেল তৈরি করার মেশিন বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
সরষের হলুদ মাঠের মাঝখানে আয়োজিত এই মাঠ দিবস কৃষকদের মধ্যে তেলজাতীয় ফসল চাষে নতুন আশার আলো জাগিয়েছে।