সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
মেহেরপুরের গোপাল দাসের জীবন সংগ্রাম | পঁচাত্তরেও পাদুকা মেরামতের কাজ ছাড়েননি
মেহেরপুর শহরের ক্যাশবপাড়ার বাসিন্দা ৭৫ বছর বয়সী গোপাল দাস। জীবনের দীর্ঘ পথ হেঁটে এসেছেন, কিন্তু দারিদ্র্যের নাগপাশ থেকে মুক্তি মেলেনি। পঁচাত্তর বছর বয়সেও পেটের তাগিদে তাকে প্রতিদিন বসতে হয় জুতা মেরামতের পসরা নিয়ে। চোখে কম দেখেন, শরীরও বয়সের ভারে ন্যুব্জ, তবু কঠোর পরিশ্রমে তার জুতা সেলাইয়ের সুতো থামেনি।
স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময় থেকে মেহেরপুর শহরের বড় বাজার মোড়ে রাস্তার ধারে জুতা-স্যান্ডেল মেরামতের কাজ করে আসছেন তিনি। একসময় পাঁচ বা দশ পয়সায় জুতা মেরামত করতেন, পঁচিশ পয়সায় করতেন পালিশ। সময়ের সাথে সাথে টাকার মূল্যমান বদলেছে, এখন জুতা মেরামতে ন্যূনতম দশ টাকা এবং পালিশের জন্য ত্রিশ থেকে চল্লিশ টাকা মজুরি পান। তবে মজুরির অঙ্ক বাড়লেও তার জীবনে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আসেনি। অভাব আগেও ছিল, এখনো আছে।
শারদীয় দুর্গা উৎসবের মহাসপ্তমীর রাতেও দেখা যায়, রাস্তার পাশে মাটির উপর বসে জুতা মেরামত করছেন গোপাল দাস। তার সামনে কাজের সরঞ্জাম এবং পাশে একটি জুতা। ছোট একটি চার্জার বাতির মৃদু আলোই তার ভরসা। গ্রাহক এলে বাতি জ্বলে, অন্যথায় রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোই সম্বল। লোডশেডিংয়ে চারপাশে ঘনিয়ে আসে অন্ধকার, তবুও কাজ থামে না। কারণ, পূজার ছুটিতে বাড়িতে এসেছেন মেয়ে-জামাই ও নাতি-নাতনিরা। তাদের আপ্যায়নের জন্য সংসারের খরচ বেড়েছে। তাই অন্য সময়ের চেয়ে বেশি সময় ধরে কাজ করতে হচ্ছে তাকে। গোপাল দাস জানান, "আগে সন্ধ্যার আগেই কাজ গুটিয়ে বাড়ি ফিরতাম। এখন তেমন কাজ পাই না, তাই রাত আটটা পর্যন্ত বসে থাকি। মেয়েরা, জামাই আর নাতি-নাতনিরা পূজায় বেড়াতে এসেছে, তাই খরচ বেড়েছে।"
গোপাল দাসের স্ত্রী পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বর্তমানে এক ছেলে শংকর দাস এবং ছেলের বউকে নিয়ে তার ছোট সংসার। ছেলে স্থানীয় একটি তেল পাম্পে কাজ করেন। বাবা ও ছেলের সামান্য আয়ে কোনোমতে চলে তাদের সংসার। দৈনন্দিন খাবারের সংস্থান হলেও ঘর মেরামত বা উৎসবের মতো বাড়তি খরচের সময় হিমশিম খেতে হয় তাদের। মেয়েরা স্বামী-সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এলে গোপালের মন ভরে ওঠে, কিন্তু সেই আনন্দও সংসারের উপর আর্থিক চাপ বাড়ায়।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার কর্মক্ষমতা কমেছে। দীর্ঘক্ষণ মাটিতে বসে কাজ করা কষ্টকর হয়ে উঠেছে। চোখের দৃষ্টিও ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তবুও এই পাদুকা কারিগরের কাজ ছাড়ার উপায় নেই। যে পেশা তাকে এত বছর বাঁচিয়ে রেখেছে, সেটাই এখনো তার একমাত্র অবলম্বন। মেহেরপুর শহরের বড় বাজার মোড় দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ যাতায়াত করেন। তাদের ছেঁড়া জুতা সেলাই করা বা পালিশ করার প্রয়োজন হলে তারা গোপাল দাসের কাছেই আসেন। এই সামান্য মজুরিই তার প্রতিদিনের আয়ের উৎস। বিশ্রামের বয়সেও গোপাল দাসের জীবন জীবিকার এই নিরন্তর সংগ্রামে আবদ্ধ। অন্ধকারেও তিনি কাজ চালিয়ে যান, কারণ তার অবসর নেই, নেই নিশ্চিন্তে বসে থাকার সুযোগ। সংসারের খরচ আর পেটের ক্ষুধার তাগিদেই ৭৫ বছর বয়সেও তাকে প্রতিদিন কাজের জায়গায় বসতে হয়।