সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
সুশীল সমাজের প্রতিবাদ ও নীরবতা | নৈতিকতা বনাম দ্বিমুখী নীতির প্রশ্ন
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বেআইনি দখলদারি, নাগরিক অধিকার হরণ কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে সুশীল সমাজের প্রতিবাদ অত্যন্ত স্বাভাবিক ও জরুরি একটি প্রক্রিয়া। দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের অনিয়ম তুলে ধরা এবং জননিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা তাদের নৈতিক দায়িত্বেরই অংশ। তবে প্রশ্ন তখনই ওঠে, যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এই ভাষা সবসময় অভিন্ন মানদণ্ডে পরিচালিত হয় না।
সম্প্রতি দেশের একদল বিশিষ্ট নাগরিকের পক্ষ থেকে দেওয়া দুটি ভিন্ন বিবৃতি এই পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। সচেতন মহলে আবারও প্রশ্ন উঠেছে—আমাদের সুশীল সমাজ কি সব সরকারের আমলেই একই নিরপেক্ষতা বজায় রেখে প্রতিক্রিয়া দেখায়?
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পেশিশক্তি খাটিয়ে খাসজমি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়ি দখল, চাঁদাবাজি এবং হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন ৩৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক। মানবাধিকার কর্মী, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিকদের স্বাক্ষরযুক্ত ওই বিবৃতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে গভীর শঙ্কা জানানো হয়।
অন্যদিকে, রাজধানীর বাংলাবাজারে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বিক্রয়কেন্দ্রে 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' বইয়ের বিক্রি বন্ধে চাপ ও কর্মীদের হেনস্তার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ৩৬ জন বিশিষ্ট নাগরিক। তারা এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানোর পাশাপাশি প্রকাশনা সংস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি তোলেন।
দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটের এই বিবৃতির মূল সুর নাগরিক অধিকার রক্ষা হলেও, সাধারণ মানুষ এর ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এই সচেতনতা কি কেবল সাম্প্রতিক কিছু নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি অতীতের বড় বড় সংকটের সময়ও তারা একই ভূমিকা পালন করেছিলেন?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সহিংসতা, মব-জাস্টিস বা দলবদ্ধ হামলা এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা ভাঙচুরের মতো অসংখ্য গুরুতর ঘটনা ঘটেছে। নতুন সরকারের পক্ষে বিগত সময়ের পুঞ্জীভূত জটলা একদিনে সমাধান করা কঠিন হলেও, যেকোনো ধরনের অপরাধের দায়মুক্তি পাওয়ার সুযোগ নেই। সমালোচনা গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে, তবে সেই সমালোচনা যদি দ্বিমুখী নীতির ওপর ভিত্তি করে হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্যতা হারায়।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা ও ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে ভাঙচুরের ঘটনার সময় এই সুশীল সমাজের অনেককেই নীরব থাকতে দেখা গেছে। যখন একটি নির্দিষ্ট ঘটনায় তাৎক্ষণিক বিবৃতি দেওয়া হয় এবং অন্য বড় ঘটনায় রহস্যজনক নীরবতা পালন করা হয়, তখন সুশীল সমাজের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
২০০৬-২০০৭ সালের চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও এক-এগারোর পট পরিবর্তনের সময় সুশীল সমাজের একাংশের যে সক্রিয় ভূমিকা ছিল, সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কারণে তাদের বর্তমান কর্মকাণ্ডকে মানুষ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সাথে অতীতের হুবহু তুলনা টানা যুক্তিযুক্ত না হলেও, তাদের সরব হওয়ার পেছনে কোনো সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে কিনা—তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সুশীল সমাজ যেমন সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, তেমনি তাদের নিজেদের নিরপেক্ষতা নিয়েও জনগণের প্রশ্ন তোলার অধিকার রয়েছে। দেশে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। সুশীল সমাজ যদি দলমত নির্বিশেষে সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে একই মানদণ্ডে কথা বলে, তবেই সমাজে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকবে।