জাতীয় নির্বাচন কার হাতে উঠবে জয়ের মালা? ফিরে দেখা বিগত দশকের নির্বাচনী চালচিত্র
চুয়াডাঙ্গা-১ আসন। নামটির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতির এক বিশাল প্রেক্ষাপট। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গার চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কার্যালয়—সবখানেই এখন একটাই প্রশ্ন: এবার কে হচ্ছেন এই আসনের ভাগ্যবিধাতা? দীর্ঘ ৫০ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় এই আসনটি কখনো একক কোনো দলের স্থায়ী দুর্গ হয়ে থাকেনি, বরং সময়ের সাথে সাথে বারবার পাল্টেছে এর রাজনৈতিক রঙ।
চুয়াডাঙ্গার সংসদীয় ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ (তৎকালীন কুষ্টিয়া-৬) আসনে বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছিলেন আওয়ামী লীগের ব্যারিস্টার বাদল রশীদ। তবে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের বিয়োগান্তক ঘটনার পর রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৭৯ সালে যখন দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তখন এই জনপদে অভিষেক ঘটে বিএনপির। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জয়ী হন মিয়া মোহাম্মদ মনসুর আলী। এরপর আশির দশকে আসন বিভাজন ও নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণে ১৯৮৪ সালে কুষ্টিয়া-৭ থেকে বর্তমান চুয়াডাঙ্গা-১ আসনটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়।
এর পরবর্তী দশকটি ছিল ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের চমক দেখানোর সময়। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির জোয়ারের মধ্যেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘হরিণ’ প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন মকবুল হোসেন। আবার ১৯৮৮ সালে মশাল প্রতীক নিয়ে জাসদের মোহাম্মদ শাহজাহান এই আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের পর এই আসনটি কার্যত বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালে মিয়া মোহাম্মদ মনসুর আলী, ১৯৯৬ সালে বর্তমান বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা শামসুজ্জামান দুদু এবং ২০০১ সালে সহিদুল ইসলাম বিশ্বাস—টানা তিন মেয়াদে ধানের শীষের আধিপত্য বজায় ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, চুয়াডাঙ্গার একটি বিশাল ভোটব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে ডানপন্থী রাজনীতির অনুসারী ছিল।
কিন্তু ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন এই সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে দেয়। দীর্ঘ বিরতির পর নৌকার জোয়ারে আসনটি পুনরুদ্ধার করেন জেলা আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের কান্ডারি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত টানা চারটি নির্বাচনে তিনি এই আসনের সংসদ সদস্য। ফলে দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনটি এখন আওয়ামী লীগের একক নিয়ন্ত্রণে। এই সময়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যেমন লক্ষ্য করা গেছে, তেমনি দীর্ঘ শাসনকালে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নতুন নেতৃত্বের আকাক্ষাও ভোটারদের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের বিশ্লেষণ অত্যন্ত জটিল। ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত বাংলাদেশে এই আসনের রাজনৈতিক সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ নতুন এক মোড় নিয়েছে। একদিকে দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অনুপস্থিতি। অন্যদিকে বর্তমানে এই আসনে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় তরুণ ও শিক্ষিত ভোটারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ভোটাররা প্রার্থীর ব্যক্তিগত স্বচ্ছতা, শিক্ষিত ব্যাকগ্রাউন্ড এবং উন্নয়নমুখী চিন্তাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। চুয়াডাঙ্গা জেলা শহর ও আলমডাঙ্গা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে গ্রামীণ ও শহরকেন্দ্রিক ভোটারদের চাহিদাও ভিন্ন ভিন্ন।
প্রতীক্ষার প্রহর যত কমছে, আলোচনা ততই তীব্র হচ্ছে। ভোটারদের নীরব চাহনি আর রাজনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ বলে দিচ্ছে—আগামী লড়াইটা সহজ হবে না। শেষ হাসিটার চমকটা কে দেবে চুয়াডাঙ্গার সাধারণ মানুষ এখন সেটা দেখার প্রতীক্ষায়, যা নির্ধারণ করবে আগামীর চুয়াডাঙ্গার রাজনৈতিক মানচিত্র।
| সংসদ নির্বাচন | সংসদ সদস্যের নাম | দল / প্রতীক |
| ১৯৭৩ (১ম) | ব্যারিস্টার বাদল রশীদ | বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (নৌকা) |
| ১৯৭৯ (২য়) | মিয়া মোহাম্মদ মনসুর আলী | বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (ধানের শীষ) |
| ১৯৮৬ (৩য়) | মকবুল হোসেন | স্বতন্ত্র (হরিণ) |
| ১৯৮৮ (৪র্থ) | মোহাম্মদ শাহজাহান | জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (মশাল) |
| ১৯৯১ (৫ম) | মিয়া মোহাম্মদ মনসুর আলী | বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (ধানের শীষ) |
| ১৯৯৬ (৬ষ্ঠ/৭ম) | শামসুজ্জামান দুদু | বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (ধানের শীষ) |
| ২০০১ (৮ম) | সহিদুল ইসলাম বিশ্বাস | বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (ধানের শীষ) |
| ২০০৮–বর্তমান | সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার (ছেলুন) | বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (নৌকা) |