চুয়াডাঙ্গায় প্রশ্নের মুখে বন ব্যবস্থাপনা।। সরকারের বৃক্ষরোপণের আহ্বান, আর চুয়াডাঙ্গায় বৃক্ষ নিধনের উৎসব
সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
চুয়াডাঙ্গায় প্রশ্নের মুখে বন ব্যবস্থাপনা।। সরকারের বৃক্ষরোপণের আহ্বান, আর চুয়াডাঙ্গায় বৃক্ষ নিধনের উৎসব
রহমান মুকুল: একদিকে দেশজুড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে আরও বেগবান করতে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিবছরই কোটি কোটি চারা রোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। অন্যদিকে, আলমডাঙ্গা -চুয়াডাঙ্গায় একের পর এক পরিণত ও মূল্যবান বৃক্ষ কেটে ফেলার ঘটনায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। পরিবেশ সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন—যেখানে একটি পরিণত বৃক্ষ গড়ে উঠতে কয়েক দশক সময় লাগে, সেখানে সেগুলো অপসারণের সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক এবং কতটা স্বচ্ছ?
সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সামনের ২৬টি মেহগনি গাছ বন বিভাগের অনুমোদনে টেন্ডারের মাধ্যমে কেটে ফেলা হয়েছে। এর আগে আলমডাঙ্গায় মহিলা কলেজের পেছনে সরকারি সড়কের কয়েকটি কড়ই গাছ এক ব্যক্তি অবৈধভাবে কেটে নেওয়ার ঘটনাও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় জনপরিসর ও পরিবেশকর্মীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, উন্নয়ন বা অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন থাকলেও পরিণত বৃক্ষ সংরক্ষণের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত ছিল।
পরিবেশবিদদের মতে, একটি পরিণত গাছের মূল্য শুধু তার কাঠে সীমাবদ্ধ নয়। একটি বড় বৃক্ষ প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, অক্সিজেন সরবরাহ করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে, বৃষ্টিপাতের প্রাকৃতিক চক্রকে সহায়তা করে এবং অসংখ্য পাখি ও প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। ফলে একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ কেটে তার পরিবর্তে কয়েকটি চারা রোপণ করলেই পরিবেশগত ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ হয় না।
চুয়াডাঙ্গা জেলা এমনিতেই দেশের অন্যতম জলবায়ু-সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানকার আবহাওয়া চরম ভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতি বছরই দেশের সর্বোচ্চ গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা এবং সর্বনিম্ন শীতকালীন তাপমাত্রার রেকর্ড এই জেলার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়। গ্রীষ্মে দাবদাহ, শীতে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এখানকার মানুষের জীবন ও কৃষিকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় ছায়াবৃক্ষ সংরক্ষণকে পরিবেশবিদরা বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য প্রয়োজন হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি গাছ নিলামের প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। চুয়াডাঙ্গায় বন বিভাগের জেলা পর্যায়ের কোনো পূর্ণাঙ্গ কার্যালয় না থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম কুষ্টিয়া বন বিভাগের অধীনে পরিচালিত হয়। এই ব্যবস্থার সুযোগে কিছু অসাধু ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে নামমাত্র মূল্যে মূল্যবান গাছ নিলাম নেওয়া হয়। কুষ্টিয়া বনবিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে চুয়াডাঙ্গা বনবিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা -কর্মচারীর যোগসাজস রয়েছে। —এমন অভিযোগ স্থানীয়দের মুখে প্রায়ই শোনা যায়।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বলেও দাবি করছেন স্থানীয়রা। অতীতে আলমডাঙ্গার জামজামি-হুগলারদাড়ি, হাউসপুর-আটকপাট সড়কের বহু পুরোনো গাছ এবং জেহালা ইউনিয়নের অঘোরনাথপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী বটগাছ কেটে ফেলার ঘটনাও স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। প্রতিবারই কিছু গাছ হারিয়ে যায়, কিন্তু তার সঙ্গে হারিয়ে যায় এলাকার পরিবেশগত ঐতিহ্য, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের আবেগের একটি অংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়ন ও পরিবেশ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উন্নয়নের নামে যদি পরিণত বৃক্ষ নির্বিচারে কেটে ফেলা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার মূল্য দিতে হয় পুরো সমাজকে। একটি রাস্তা প্রশস্ত করা বা ভবন নির্মাণের প্রয়োজন থাকতেই পারে, কিন্তু প্রকল্প পরিকল্পনার সময় বিকল্প নকশা, গাছ স্থানান্তরের সম্ভাবনা কিংবা ক্ষতি কমানোর উপায় কতটা বিবেচনা করা হয়েছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিশ্বের অনেক দেশেই এখন শতবর্ষী বা পরিণত বৃক্ষ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যেও অবৈধ বৃক্ষনিধনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের নজির রয়েছে। পরিবেশ ধ্বংসকে সেখানে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশেও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বৃক্ষ সংরক্ষণে আরও কার্যকর আইন প্রয়োগ ও কঠোর নজরদারির দাবি জোরালো হচ্ছে।
পরিবেশকর্মীদের মতে, সরকারি গাছ কাটার ক্ষেত্রে প্রতিটি সিদ্ধান্তের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ এবং নিলাম প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে যে পরিমাণ গাছ কাটা হবে, তার কয়েকগুণ বেশি বৃক্ষরোপণ এবং সেগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা নিশ্চিত করাও জরুরি।
চুয়াডাঙ্গার মানুষ আজ কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর জানতে চান। যে গাছগুলো কাটা হয়েছে, সেগুলো অপসারণ সত্যিই অনিবার্য ছিল কি? বিকল্প কোনো পথ কি বিবেচনা করা হয়েছিল? নিলাম প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল? আর সবচেয়ে বড় কথা, যে জেলা প্রতিবছর চরম গরম ও তীব্র শীতের সঙ্গে লড়াই করে, সেখানে পরিণত বৃক্ষ রক্ষায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কবে গ্রহণ করা হবে?
সবুজ হারানো মানে শুধু কয়েকটি গাছ হারানো নয়; হারিয়ে যায় শীতল ছায়া, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নির্মল বাতাস, পাখির আবাস, মানুষের স্বস্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিবেশগত নিরাপত্তা। তাই বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি বিদ্যমান পরিণত বৃক্ষ সংরক্ষণকেও জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার এখনই সময়।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
আলমডাঙ্গায় ফিরোজা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও লোকমান হোসেন প্রাইভেট হাসপাতালে ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা : দুইটি ক্লিনিকের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ
১১ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব
১১ ঘন্টা আগে
দামুড়হুদায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আ.লীগ নেতা মামুন গ্রেপ্তার
১৪ ঘন্টা আগে