জাতীয় নির্বাচন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে আওয়ামী লীগের ভোট কে পাবে?
গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। চুয়াডাঙ্গা-১ (সদর ও আলমডাঙ্গা) আসনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বর্তমানে প্রায় স্থবির হলেও দলটির বিশাল এক ‘নীরব’ ভোটার ব্যাংক রয়েছে। এখন এই ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানতে আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে এক গোপন প্রতিযোগিতা।
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলো মনে করছে, নিজেদের দলীয় ভোটের বাইরে আওয়ামী লীগের সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের ভোট যে প্রার্থী বেশি পাবেন, তিনিই জয়ের পথে এগিয়ে থাকবেন। ফলে এই ভোট নিজেদের বাক্সে নিতে পর্দার আড়ালে নানা কৌশল নিচ্ছে দলগুলো।
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে গত চারটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের (১৯৯১-২০০৮) ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আসনটিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল খুবই কম। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কোনো অস্তিত্ব নেই। দলটির সাবেক সংসদ সদস্যসহ শীর্ষ পর্যায়ের অধিকাংশ নেতা আত্মগোপনে বা কারাগারে রয়েছেন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের একটি বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে নাও যেতে পারেন। তবে যাঁরা যাবেন, তাঁদের লক্ষ্য করেই এখন হিসাব কষছেন অন্য প্রার্থীরা।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগের ভোট প্রাপ্তি তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। প্রথমত, কোনো প্রার্থী আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন কি না। দ্বিতীয়ত, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের কর্মীদের ওপর বৈরী আচরণের মাত্রা। তৃতীয়ত, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক।
চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা গ্রামীণ পর্যায়ে ‘সামাজিক মিটমাট’ বা রিকনসিলিয়েশনের ওপর জোর দিচ্ছেন। অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের সাবেক সমর্থকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা মামলার বিষয়ে সহযোগিতার মৌখিক আশ্বাস দিয়ে নিজেদের বলয়ে আনার চেষ্টা চলছে। বিএনপির নেতারা মনে করেন, যেহেতু আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তাই দেশপ্রেমিক ভোটাররা বিএনপির পতাকাতলে আসবে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও বসে নেই। বিশেষ করে আলমডাঙ্গা উপজেলায় জামায়াতের দীর্ঘদিনের একটি শক্ত ভিত্তি রয়েছে। তারা এবার সংখ্যালঘু ভোটারদের প্রতি বিশেষ নজর দিচ্ছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ প্রথাগতভাবে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে আসত। জামায়াত এবার তাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সংখ্যালঘু নেতাদের যুক্ত করে এই ধারণা ভাঙার চেষ্টা করছে। জেলা জামায়াতের একজন নেতা জানান, “আওয়ামী লীগের সমর্থক হলেও তারা তো এ দেশের নাগরিক। আমরা সবার ভোটাধিকার এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথা বলছি।”
চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে বাইরে রাখার পক্ষে সবাই একমত থাকলেও দলটির ভোট নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগের ভোট যে প্রার্থীর পক্ষে যাবে, সেই ভোটই হবে ‘ফ্যাক্টর’। তবে অপরাধীদের প্রশ্রয় দিয়ে ভোট টানার এই কৌশল সুস্থ রাজনীতির জন্য ইতিবাচক কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক তৃণমূল কর্মী বলেন, “আমাদের নৌকা নেই, তাই কার পক্ষে যাব বা ভোট দেব কি না, তা নিয়ে আমরা এখনো দ্বিধায় আছি। তবে যারা আমাদের এই বিপদে পাশে দাঁড়াচ্ছে, তাদের কথা মাথায় রাখব।”
চন্দনাইশ বা বাগেরহাটের মতো চুয়াডাঙ্গাতেও আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যবসায়ী বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে প্রার্থীরা নিজেদের নির্বাচনী বলয়ে টেনেছেন। শেষ পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের এই ‘নীরব ভোট’ কোন দিকে মোড় নেয়, তা প্রচার শুরু হলে আরও স্পষ্ট হবে।