আলমডাঙ্গায় বিবাহবিচ্ছেদের মহামারি: অর্ধেকের বেশি বিয়েই টিকছে না
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায় বিবাহবিচ্ছেদের হার এখন চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে এই উপজেলায় যতগুলো বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে, তার অর্ধেকেরও বেশি বিচ্ছেদে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে তরুণী, অল্প বয়সী নারী ও প্রবাসীদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে তালাকের আবেদন করার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আলোচিত সময়ে আলমডাঙ্গা উপজেলায় মোট ২ হাজার ৪৩১টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। এর বিপরীতে একই সময়ে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ২৩৭টি। অর্থাৎ সম্পাদিত বিয়ের প্রায় ৫০ দশমিক ৮ শতাংশই বিচ্ছেদে গড়াচ্ছে। পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরাই বিচ্ছেদের আবেদনে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।
স্থানীয় প্রশাসন, কাজী অফিস এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে বিচ্ছেদের পেছনে বেশ কিছু গভীর সামাজিক ও মানসিক কারণ উঠে এসেছে। বিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে ঠুনকো অজুহাতেও ভেঙে যাচ্ছে সাজানো সংসার।
বিচ্ছেদের পেছনে প্রবাস জীবনের প্রভাবও স্পষ্ট। আলমডাঙ্গার অনেক পুরুষ বর্তমানে কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে বিদেশে অবস্থান করছেন। দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকা দম্পতিদের মধ্যে তৈরি হওয়া মানসিক দূরত্ব ও একাকিত্ব পারিবারিক কলহকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া যৌতুক এবং মাদকাসক্তির কারণে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেক নারী বিচ্ছেদের পথ বেছে নিচ্ছেন।
সামাজিক এই অবক্ষয়ের পেছনে ভিন্ন মতও পাওয়া গেছে। আলমডাঙ্গা শহরের একটি চায়ের দোকানে আলাপকালে ইমরান নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েদের বিচ্ছেদের পেছনে মায়ের কুপরামর্শ কাজ করে। মায়ের অযাচিত হস্তক্ষেপে মেয়ের সংসার জীবনে অশান্তি শুরু হয়।’
শিক্ষা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। আলমডাঙ্গা সরকারি কলেজের এক শিক্ষক জানান, অনেক ক্ষেত্রে উচ্চাশা ও বিলাসিতার প্রবণতা থেকে অন্য দম্পতিদের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা শুরু হয়। এই অসম প্রতিযোগিতার ফলে দাম্পত্য জীবনে ছন্দপতন ঘটছে। এছাড়া অল্প বয়সে বিয়ের কারণে মানসিক পরিপক্কতা না আসায় ব্যক্তিত্বের সংঘাত ও মতের অমিল প্রকট হয়ে উঠছে।
বিবাহবিচ্ছেদের এই হিড়িকের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদে শিশুরা সঠিক পারিবারিক শিক্ষা ও যত্ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী মানসিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পারিবারিক মামলা ও সামাজিক অস্থিরতা।
বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বাল্যবিবাহ রোধের পাশাপাশি বিয়ের আগে দম্পতিদের কাউন্সেলিং এবং সামাজিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
আলমডাঙ্গায় চাপাতি ও লোহার চেইনসহ সোহেল রানা রাব্বি গ্রেফতার
১০ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গা বাজারে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত: ৫ ব্যবসায়ীকে ২২ হাজার টাকা অর্থদন্ড প্রদান
১০ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গা উপজেলা প্রশাসনের মাদকবিরোধী কঠোর অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী হুসাইনসহ আটক ৪ : ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদণ্ড ও অর্থদন্ড
১০ ঘন্টা আগে