শিক্ষক-প্রাবন্ধিক-সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী: মোঃ খাইরুল ইসলাম
সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
ভাষার প্রশ্নে সংকীর্ণতা নয় উদারতা চাই
ফেব্রুয়ারি আসলেই সামাজিক মাধ্যমে নানা ভাষা প্রেমিকের উদয় হয়। তারা খাঁটি বাঙালি হতে চান। বিভিন্ন বিদেশি শব্দকে নানাভাবে ট্যাগিং করে তা বর্জন করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকেন। একটু গভীরভাবে দেখলে দেখা যাবে যারা এই ট্যাগিঙের সঙ্গে জড়িত তাদের বাপ-দাদা এমনকি নিজের নামটিও হয়তো অন্য কোন ভাষা হতে এসেছে। অথচ বাংলা ভাষার ক্যাঁচাল সৃষ্টি করে তারা আলাদাভাবে ভাষাপ্রীতি দেখাতে চান। বাস্তবে তাদের এ ভাষাপ্রীতির পেছেনে থাকে অন্য কোন গোপন উদ্দেশ্য বা এজেন্ডা। দেশ বিভাগের পরপরই বাংলা ভাষার পক্ষে ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭ সালে অধ্যাপক আবুল কাশেম ও অন্যান্য মিলে ‘তমুদ্দিন মজলিশ’ নামে যে সংগঠন তৈরি করেছিলেন তার শব্দযুগল অর্থাৎ ‘তমুদ্দিন’ ও ‘মজলিশ’ উভয় আরবি শব্দ।
বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধনের জন্য ৩ ডিসেম্বর, ১৯৫৫ সালে ঢাকায় যে প্রতিষ্ঠান যাত্রাশুরু করে তার নাম ‘বাংলা একাডেমি; এবং ভাষা শহিদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে ‘শহিদ মিনার’। আবার শহিদ মিনারে পুষ্প দিয়ে যে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়া হয় সেটিও খাঁটি বাংলা শব্দ নয়। মুসকিলের কথা হল বাংলা শব্দটি নিজেও বাংলা নয়। ‘বাংলা’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত বোঙ্গা>বঙ> তার সাথে ফারসি ‘আল’ প্রত্যযুক্ত হয়ে হয়েছে ‘বাঙ্গ+আল=বাঙ্গাল। বাঙ্গাল হতে কালক্রমে ‘বাংলা’ রূপ লাভ করেছে। একাডেমি শব্দটি বাংলা ভাষায় এসেছে ইংরেজি ভাষা হতে। একাডেমি শব্দটি আবার ব্রিটিশদের নিজের নয়। তারা একাডেমি শব্দটি গ্রহণ করেছে প্রাচীন গ্রিকদের নিকট হতে। অপরদিকে ‘শহিদ’ ও ‘মিনার’ শব্দ দুটি এসেছে আরবি হতে, ‘পুষ্প’ ও ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শব্দদ্বয় এসেছে সংস্কৃতি হতে। বিভিন্ন ভাষা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সবদেশের ভাষায়ই মিশ্রভাষা। নানা চড়াই-উৎরায়ে ভাষা একটি সর্বজনীন রূপ লাভ করে। বাংলা ভাষাও তার ব্যতিক্রম নয়। বাঙালি জাতির মত বাংলা ভাষাও একটি সংকর বা মিশ্রভাষা।
নৃতাত্তিক বিশ্লেষণে আমরা দেখতে পায় প্রখ্যাত ঐতিহাসিক নিহাররঞ্জন রায় তাঁর 'বাঙালির ইতিহাস' গ্রন্থের আদি পর্বে এক অমোঘ সত্য উচ্চারণ করেছেন-"বাঙালি একটি সংকর জাতি"। আমাদের এই বদ্বীপ হাজার বছর ধরে আর্য, অনার্য, দ্রাবিড় ও মঙ্গোলীয় নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর এক বিশাল মিলনস্থলে পরিণত হয়েছিল। এই যে রক্ত আর জিনের সংমিশ্রণ, তার প্রতিফলন বাঙালির শরীরের গড়নেই নয়, তার 'ভাষা'র মধ্যেও সমানভাবে দেদীপ্যমান।
বাঙালি জাতির কোনো নির্দিষ্ট বা 'বিশুদ্ধ' শারীরিক ছাঁচ নেই। আমাদের মাঝে কেউ দীর্ঘদেহী, কেউ খর্বকায়; কারো গায়ের রঙ দুগ্ধশুভ্র ফর্সা, কারো বা তামাটে কালো; কারো নাসিকা তীক্ষ্ণ, কারো বা স্থূল। কিন্তু এই শারীরিক ভিন্নতা সত্ত্বেও আমাদের পরিচয় একটাই আমরা বাঙালি। ঠিক একইভাবে, বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারও বিচিত্র উৎস থেকে আসা শব্দের এক মহাসম্মিলন ঘটেছে। এ মহাসম্মিলনে বাংলা শব্দভান্ডারে নতুন শব্দযুক্ত হয়েছে সামাজিক, রাজনৈতি, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়সহ নানা প্রভাবে।
একটি ভাষা যখন কোনো শব্দকে তার ব্যাকরণ ও উচ্চারণের ছাঁচে ফেলে গ্রহণ করে, তখন সেই শব্দের আদি পরিচয় গৌণ হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ- 'ইনসাফ', 'ইনকিলাব' 'বন্দোবস্ত', ‘জিন্দাবাদ’ কিংবা ‘ইত্তেফাক’ শব্দগুলোর কথা বলা যায়। এ শব্দগুলি নিয়ে বর্তমানে অনেক বিতর্ক ওঠেছে।
ইনসাফ: এটি আরবি মূল থেকে এলেও আজ এটি বাঙালির কাছে 'ন্যায়বিচার'-এর এক বলিষ্ঠ প্রতিশব্দ।
ইনকিলাব: শব্দটি মূলত আরবি। ইনকিলাব শব্দটি আরবি-হিন্দি হয়ে বাংলা ভাষায় প্রবেশ করেছে। শাব্দিক অর্থে বিপ্লব; যা বাঙালির রাজনৈতিক লড়াই ও সংগ্রামের ইতিহাসের সাথে মিশে গেছে।
বন্দোবস্ত: ফার্সি থেকে আসা এই শব্দটি আমাদের প্রশাসনিক ও প্রাত্যহিক জীবনের এমন স্তরে মিশেছে যে, এর বিকল্প কোনো শব্দ বাঙালির মুখে আর স্বাভাবিক শোনায় না।
জিন্দাবাদ: ফার্সি শব্দ। এটি ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির দীর্ঘজীবিতা কামনা করে শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
ইত্তেফাক: আরবি শব্দ। শব্দটি আরবি ভাষা হতে ফার্সি হয়ে বাংলা ভাষায় মিশে গেছে। যার অর্থ ঐক্য, সম্মতি ।
এছাড়া আনরস, পেয়ারা, চেয়ার-টেবিল, নামাজ-রোজা, কম্পিউটার, আইন-আদলত, মোবাইল ইত্যাদি শব্দগুলি এখন আর 'বিদেশি' বা 'ধর্মীয়' শব্দ নয়, বরং বাঙালির দীর্ঘ লড়াই, শাসন ও সংস্কৃতির রাজসাক্ষী। একবার যখন একটি শব্দ বাংলা শব্দভাণ্ডারে প্রবেশ করে, তখন তা আর 'হিন্দুয়ানি', 'পাকিস্তানি' কিংবা 'মৌলবাদী' শব্দ থাকে না; তা হয়ে ওঠে 'বাংলার নিজস্ব সম্পদ'।
বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার বিশ্লেষণ করলে আমরা আরও দেখতে পাই, এটি নির্দিষ্ট কোন উৎসের ওপর নির্ভরশীল নয়। বিভিন্ন উৎস থেকে বাংলাভাষা তার শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ করেছে। যেমন-
তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ : প্রায় ১৫০০ খ্রি:পূ ভারতে ইন্দো-ইইরেপীয় ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা ছিল বৈদিক ভাষা। প্রাচীন বৈদিক ভাষা থেকে হাজার বছরের পরিক্রমায় সংস্কৃত রূপে গ্রহণ করেছে। সেই সংস্কৃত হতেই মধ্য ও আধুনিক যুগে সাধু ভাষার হাত ধরে সংস্কৃত শব্দের একটি বিশাল অংশ (প্রায় ২৫ শতাংশ) বাংলায় সরাসরি প্রবেশ করেছে। যা বর্তমানে বাংলা ভাষা হিসেবেই গ্রহণ করা হয়।
অর্ধ-তৎসম শব্দ : কালেরযাত্রায় যখন সংস্কৃত শব্দ ধীরে ধীরে মানুষের মুখে একটু বিকৃত বা লোকজ রূপ নিয়েছে, তখন তাকে আমরা অর্ধ-তৎসম বলছি (যেমন: ছেরাদ্দ,পরান,ঘেন্না, গিন্নি, জোসনা)। বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে প্রায় ৫ শতাংশ শব্দ যুক্ত হয়েছে অর্ধ-তৎসম শব্দ থেকে।
তদ্ভব শব্দ : বাংলা ভাষার বৃহৎ অংশ জুড়ে রয়েছে তদ্ভব শব্দ। সংস্কৃত থেকে প্রাকৃতের মাধ্যমে বিবর্তিত হয়ে আসা এই শব্দগুলোই আমাদের ভাষার সিংহভাগ প্রায় ৬০ শতাংশ স্থান দখল করে আছে। তদ্ভব শব্দই বাংলার মূল ভিত্তি হয়ে আছে।
বিদেশি শব্দ : ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বাংলা ভূখণ্ড বারবার আক্রান্ত ও শাসিত হয়েছে বিদেশিদের দ্বারা। এ ভূখণ্ডে এসেছে অনেক সুফি-সাধক বা ধর্মপ্রচারক। ফলে আরবি, ফার্সি, তুর্কি, ইংরেজি, পর্তুগিজ ও ওলন্দাজ শব্দ হতে প্রায় ৮ শতাংশ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
দেশি শব্দ : এ দেশে যারা আদিম অধিবাসী ছিল (ভীম, সাওতাল, মুণ্ডা, কোল, শবর) তাদের ব্যবহৃত শব্দগুলো সংখ্যায় খুবই কম । যা বাংলার মোট শব্দভাণ্ডারের মাত্র ২ শতাংশ। এই ২ শতাংশই আমাদের শিকড়ের পরিচয় বহন করে।
এখন আসি মূল কথায়। ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের বাহন নয়, ভাবনারও বাহন। সেই ভাব ও ভাবনা প্রকাশের মূল বা একক হল শব্দ। শব্দ যখন আমাদের হৃদয়ের আবেগ প্রকাশ করে, তখন তার গায়ে কোনো দেশি-বিদেশি, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক তকমা সেঁটে দেওয়া ভাষাতাত্ত্বিক মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
অনেকে ভাষার 'বিশুদ্ধতা'র দোহাই দিয়ে বাংলা ভাষায় বিভাজনের দেয়াল তুলতে চান। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হলো, বিশুদ্ধ থাকার গোঁড়ামি ভাষাকে স্থবির ও মৃতপ্রায় করে তোলে। বাঙালি কেবল রক্তেই আর্য-অনার্য-ইউরোপীয়-মোঙ্গলয়েড সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটায়নি, আমাদের শব্দভাণ্ডারেও নিয়ে এসেছে এক অনন্য উদারতা। অক্সিজেনের বদলে 'অম্লজান' বা চেয়ারের বদলে 'কেদারা,' 'নামাজের বদলে 'প্রার্থনা', ফুটবলের বদলে ‘পাদগোলক’ ফেসবুকের বদলে ‘বদনবই বা মুখবই’ বলার যে আড়ষ্টতা, তা কাটিয়ে বাংলা ভাষা সকল ঘরানার শব্দকে পরম মমতায় আপন করে নিয়েছে। এই শব্দগুলো এখন বাঙালির প্রাণের ভাষা।
আখেরে বলা যায় নিহাররঞ্জন রায় বাঙালির যে নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় তুলে ধরেছিলেন, বাংলা ভাষার শব্দতাত্ত্বিক কাঠামো তারই এক জীবন্ত দলিল। নদীর যেমন নির্দিষ্ট কোনো রঙ নেই, সে যে মাটির ওপর দিয়ে বয়ে যায় সেই মাটির বর্ণ ধারণ করে; বাংলা ভাষাও তেমনি বাঙালির বর্ণাঢ্য ইতিহাসের নানা ভাষার শব্দ নিয়ে গড়ে তুলেছে ভাষার রংধনু।
আমাদের গায়ের রঙ বা নাক-মুখের গড়ন যেমন আমাদের বাঙালিত্বকে খণ্ডিত করে না, তেমনি বিচিত্র উৎস থেকে আসা শব্দগুলোও আমাদের ভাষার স্বতন্ত্র সত্তাকে ক্ষুণ্ণ করে না। এই সংকরত্ব, এই অসাম্প্রদায়িক চরিত্র এবং শব্দকে আপন করে নেওয়ার বিস্ময়কর ক্ষমতাই বাংলা ভাষাকে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী ও মাধুর্যপূর্ণ ভাষায় রূপান্তর করেছে। বাংলা ভাষার সঙ্গে অন্য ভাষা গ্রহণ ও মিশ্রণের উদারতা দেখাতে পারলেই কেবল এ ভাষাভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে। অন্যথায় স্রোতহীন মৃত নদীর মতো বাংলা ভাষা মৃত ভাষায় পরিনত হবে। বাংলা ভাষার সঙ্গে অন্য ভাষার শব্দের মিশেল দূষণীয় নয় বরং বাংলা ভাষা সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করবে। তাই ভাষার প্রশ্নে সংকীর্ণতা নয় উদারতা চাই।
লেখক : শিক্ষক-প্রাবন্ধিক-সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।