সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
বিশ্বকাপে আর্লিং হালান্দের নিষ্প্রভতা | 'নিমকহারামি' এড়ানোর প্রচেষ্টা নাকি অন্য কারণ?
বিশ্বকাপের মঞ্চে তারকা খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্দ। অনেকের মনে প্রশ্ন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তিনি কি সজ্ঞানেই নিজের সেরাটা দেননি? নাকি এর পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক 'নিমকহারামি'র অভিযোগ এড়ানোর এক সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা, যা সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার দিয়েগো ম্যারাডোনাকে একসময় বিড়ম্বনায় ফেলেছিল?
আজ থেকে প্রায় ৩৬ বছর আগে, ১৯৯০ সালের ৩রা জুলাই, ইতালির বিশ্বকাপ আসর বসেছিল ন্যাপোলির মাঠে। আয়োজক ইতালির মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই লড়াই নিজ চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল মতিউর রহমান চৌধুরীর। দিয়েগো ম্যারাডোনা তখন ন্যাপোলির কিংবদন্তি। শহরের ঘরে ঘরে তিনি ছিলেন ঈশ্বরতুল্য। কিন্তু সেই ম্যাচে ইতালি হেরে যাওয়ার পর ম্যারাডোনাকে নিয়ে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। তাকে 'বেইমান', 'বিশ্বাসঘাতক' এবং 'নিমকহারাম' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। অভিযোগ ছিল, ন্যাপোলির ভালোবাসা ও সমর্থনের প্রতিদান তিনি দেননি, বরং তাদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছিলেন।
আর্লিং হালান্দ কি ম্যারাডোনার সেই বদনামের পুনরাবৃত্তি চাননি? ফুটবল বিশ্বকে স্তম্ভিত করে তিনি কি এই কারণেই নিষ্প্রভ ছিলেন? নাকি শারীরিক কারণে তিনি পেরে উঠছিলেন না, অথবা দ্বিতীয় গোল বাতিলের পরই ম্যাচের ফলাফল আঁচ করতে পেরেছিলেন? সবাই জানেন, হালান্দের জন্ম ইংল্যান্ডে এবং তিনি বর্তমানে ইংল্যান্ডের ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলেন। তাই অনেকের ধারণা, তিনি হয়তো ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নিজের পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চাননি। পুরো ম্যাচ জুড়েই তার পারফরম্যান্স ছিল আশানুরূপ নয়, যদিও প্রতিপক্ষ তাকে কড়া মার্কিংয়ে রেখেছিল।
মিয়ামি স্টেডিয়ামে ৬৫ হাজার ফুটবলপ্রেমী এই টানটান উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচের সাক্ষী হয়েছিলেন। বাইরের পৃথিবীতে কোটি কোটি চোখ ছিল হ্যারি কেইন এবং আর্লিং হালান্দের দ্বৈরথ দেখার অপেক্ষায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নায়ক হয়ে উঠলেন জুড বেলিংহাম। তার জোড়া গোলের সুবাদে ইংল্যান্ড চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিজেদের জায়গা করে নেয়। দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ ট্রফির অপেক্ষায়। তারা ১৯৬৬ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
স্মরণীয় ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে, দিয়েগো ম্যারাডোনা বিতর্কিত 'হ্যান্ড অফ গড' গোল করে ইংল্যান্ডের বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। সেই গোল নিয়ে আজও অনেক গবেষণা ও বিতর্ক রয়েছে। ব্রিটিশরা এখনও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে ম্যারাডোনা অত্যন্ত সুচতুরভাবে হাত দিয়ে গোল করেছিলেন। ম্যারাডোনা জীবিত থাকা অবস্থায় কখনো এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেননি, বরং রহস্য করে বলেছিলেন, "ওটা ছিল ঈশ্বরের হাত।"
ম্যাচে সতীর্থদের কাছ থেকে বলের জোগান না পেয়ে হালান্দকে বেশ হতাশ দেখাচ্ছিল। একবার ফাঁকা জায়গায় বলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকলেও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ফরোয়ার্ড আলেকজান্ডার সরলোথ বলটি না দিয়ে নিজেই গোল করার চেষ্টা করলে হালান্দ মাঠেই বিরক্তি প্রকাশ করেন। নরওয়ের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক Aftenposten এই খেলা সম্পর্কে মন্তব্য করেছে, "কষ্টটা অসীম। তবে এই বিশ্বকাপ ছিল অসাধারণ। আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ। পুরো যাত্রাটিই ছিল এক আনন্দময় উৎসব।"
ম্যাচের প্রথমার্ধে প্রথমে এগিয়ে থেকেও নরওয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেদের লিড ধরে রাখতে পারেনি। প্রথমার্ধের শেষ বাঁশি বাজার আগেই জুড বেলিংহাম গোল করে ইংল্যান্ডকে সমতায় ফেরান। ম্যাচের ফলাফল হয়তো অন্যরকম হতে পারত, কারণ নরওয়ে একটি গোল করেছিল যা হালান্দের ফাউলের অভিযোগে বাতিল করা হয়। এরপর বেলিংহামের দ্বিতীয় গোল ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালে নিয়ে যায়। এই গোলটির আগেও গোলরক্ষক বল রুখে দিলেও তা তার হাত ফসকে সামনে চলে আসে, আর এমন সুযোগ হাতছাড়া করেননি ইংলিশ তারকা বেলিংহাম। বল সোজা জালে পাঠিয়ে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন তিনি। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল স্পেন-বেলজিয়ামের ম্যাচে, যেখানে মিকেল মেরিনো একইভাবে বল পেয়েছিলেন। দুই দলের সেমিফাইনালে যাওয়ার পথ প্রায় একই রকমভাবে নির্ধারিত হলো।
এতকিছুর পরও ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল তার দলের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট নন। তিনি বলেন, "আমি একদমই সন্তুষ্ট না। বলা চলে আমি হতাশ। ইংল্যান্ড আরও ভালো খেলবে এটাই আমার আশা ছিল।"