সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
গাজীপুরের প্রকৃতির বুকে এক চঞ্চল আবাসিক পাখি ও তার জীবনচক্র
গত ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএস (ফরেস্ট্রি) দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ক্লাস চলছিল। এই ক্লাসের অংশ হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের পাখি ও প্রাণী চেনাতে ক্যাম্পাসময় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ড. আ ন ম আমিনুর রহমান। গাছপালাসমৃদ্ধ এই প্রাকৃতিক ক্যাম্পাসে রয়েছে প্রচুর পাখি ও প্রাণী।
প্রথম দিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা ২০ মিনিট পর্যন্ত পাখি-প্রাণী খুঁজে বন ও পরিবেশ অনুষদের আমলকী বাগানের পাশের রাস্তা দিয়ে ফেরার সময় তিনি হঠাৎ রাস্তার পাশের লম্বা ঘাস নড়তে দেখে থমকে দাঁড়ান। অতি সতর্কতার সাথে সামনে এগোতেই ঘাস নড়ার কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাঁচটি ছোট পাখি, যা ঘর চড়ুইয়ের থেকেও ক্ষুদ্র, ব্যস্তভাবে ঘাসবীচি খাচ্ছিল। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে দ্রুত কয়েকটি ছবি তোলেন তিনি। ছবি তুলতে তুলতে তিনি আরও সামনে এগোতেই পাখিগুলো পাশের একটি নারকেল গাছের পাতায় গিয়ে বসে। এবার বেশ কিছু ভালো ছবি তোলা সম্ভব হয়।
পরদিন বিকেলে যখন তিনি ফের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে বের হয়েছেন, তখনও আমলকী বাগানের বেড়ার কাছের ঘাস থেকে একই প্রজাতির পাঁচ থেকে ছয়টি পাখিকে ঘাসবীচি খেতে দেখেন। তবে এদের পালকের রঙ কিছুটা হালকা এবং বুক-পেটে কোনো তিলচিহ্ন ছিল না, যা থেকে বোঝা যায় এগুলো ছানা। বেশ কিছু ছবি তোলার পর পাখিগুলো উড়ে গতকালের জায়গায় চলে যায়। লেখক ও শিক্ষার্থীরাও খানিকটা এগিয়ে সেখানে যেতেই ছানাগুলো ছাড়াও তিনটি-চারটি বয়স্ক পাখির দেখা পান। সবাই ঘাসবীচি খাওয়ায় ব্যস্ত ছিল।
ড. আমিনুর রহমান প্রায় ষোলো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ক্যাম্পাসে পাখিগুলোকে পর্যবেক্ষণ করছেন। এক যুগ আগে একদিন বিকেলে আমলকী বাগানের খানিকটা সামনের মাঠে ও বিভিন্ন গাছে শতাধিক একই প্রজাতির পাখিকে তিনি একসঙ্গে দেখেছিলেন। আজও ক্যাম্পাসে তাদের বিচরণ বেশ চোখে পড়ার মতো। এতক্ষণ যে পাখিগুলোর কথা বলা হলো, তারা হলো আমাদের অতি পরিচিত ও সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি ‘তিলা মুনিয়া’। ইংরেজিতে এদের Scally-breasted বা Spotted Munia বলা হয়। ইস্ট্রিলডি গোত্রের এই পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম হলো Lonchura punctulata। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রজাতিটির দেখা মেলে।
প্রাপ্তবয়স্ক তিলা মুনিয়ার দৈর্ঘ্য সাধারণত ১১-১২ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১২-১৬ গ্রাম হয়ে থাকে। এদের ঠোঁট খাটো ও শক্ত, যা শস্য ও দানা খাওয়া পাখিদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। মাথা গাঢ় বাদামি, লেজসহ দেহের উপরের অংশ বাদামি বা জলপাই-বাদামি। গলাও একই রঙের এবং চিবুক গাঢ়। বুকের উপরের অংশ খয়েরি এবং অসংখ্য সাদা আঁশের মতো দাগসহ পেট কালচে-বাদামি। চোখের মণি গাঢ় বাদামি থেকে বাদামি-লাল। পা, পায়ের পাতা, নখ ও ঠোঁট কালো বর্ণের। স্ত্রী ও পুরুষ পাখির মধ্যে তেমন পার্থক্য না থাকলেও, পুরুষের বুকের দাগ ও গলার রঙ স্ত্রীর থেকেও গাঢ় হয়ে থাকে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখিদের দেহের উপরের অংশ হালকা বাদামি ও নিচের অংশ লালচে-হলুদ হয়, এদের বুকে কোনো ফোঁটা থাকে না।
এদেশের শহর-বন্দর-গ্রামে প্রচুর সংখ্যায় এদের দেখা যায়। অত্যন্ত চঞ্চল এই পাখিটি ফসলের ক্ষেত, মাঠ, নল-খাগড়ার বন, বাগান প্রভৃতি স্থানে ঝাঁকে ঝাঁকে চড়ে বেড়ায়। এদের প্রধান খাবার হলো ঘাসেরবীচি, ধান ও অন্যান্য শস্যদানা। মুখে বীজ রেখেই এরা চমৎকারভাবে তার শক্ত খোসা ছাড়িয়ে নিতে পারে। কীটপতঙ্গও এদের খাদ্যতালিকায় থাকে। এমনিতে নিরীহ হলেও, ঝাঁক বেঁধে এরা ফসলের ক্ষতিও করতে পারে।
মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস হলো এদের প্রজননকাল। খেজুর গাছের মথির ঘন পাতার আড়ালে, লতা-ঝোপে, বাবলা, ঝাউ, কেয়া, কান্তা, দেবদারু প্রভৃতি গাছে এরা গোলাকৃতির বাসা বোনে। ঘাস, লতা ও ধানের পাতা দিয়ে সুন্দর, নরম ও তুলতুলে বাসাটির ভিত্তি রচনা করে। কাশফুল দিয়ে চারপাশটা মুড়ে নেয়। বাসার ভেতরে থাকে কাশফুলের গদি। বাসায় ঢোকার জন্য এরা গোপন সরু পথ তৈরি করে, যেন শত্রুরা সহজে দেখতে না পায়। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি উভয়ই একসঙ্গে বাসা বানানোর কাজে অংশ নেয়। লেখকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ক্যাম্পাসে বহুবার ওদেরকে দালানের কার্নিশের নিচে ও টোনারের খালি কার্টনে বাসা বানাতে দেখা গেছে। শুধুমাত্র গ্র্যাজুয়েট অনুষদ ও আশপাশে প্রতিবছর কমপক্ষে ২০-২৫টি বাসা দেখা যায়।
স্ত্রী মুনিয়া চার থেকে ছয়টি ধবধবে সাদা ডিম পাড়ে, তবে সর্বোচ্চ ১০টি ডিম পাড়ার রেকর্ডও রয়েছে। স্ত্রী ও পুরুষ মিলেমিশে ১৩-১৫ দিন তা দিয়ে ডিম থেকে ছানা ফোটায়। এদের গড় আয়ুষ্কাল ছয় থেকে আট বছর। শহুরে মানুষের কাছে পোষা পাখি হিসেবে মুনিয়া বেশ জনপ্রিয়। রাস্তাঘাট ও পেটশপে খাঁচাবন্দি মুনিয়া দেদারছে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিক্রেতারা এদের গায়ে নীল, হলুদ, সবুজ বা উজ্জ্বল রঙ লাগিয়ে দেয়, যা গোসল করালেই উঠে যায়। পাখি পোষা মানুষের পুরনো শখ হলেও, এই শখের বলি হয় লাখো প্রাকৃতিক পাখি। যদিও মুনিয়াদের আবদ্ধাবস্থায় পালন ও বংশবৃদ্ধি করা যায়, তবে প্রকৃতিতে সহজলভ্য পাখিদের কষ্ট করে প্রজনন বা ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে বিক্রি করা কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এদের জাল দিয়ে ধরে টঙ্গী, ঢাকার কাঁটাবন, মিরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হয়। তাই, পাখিপ্রেমীদের প্রতি লেখক ড. আ ন ম আমিনুর রহমানের অনুরোধ, আবদ্ধাবস্থায় ব্রিডিং করা বিদেশি পাখি পুষুন এবং দয়া করে এদেশের প্রকৃতির পাখিদের খাঁচাবন্দি করবেন না। অন্যথায়, সহজলভ্য তিলা মুনিয়াগুলোও একদিন প্রকৃতি থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।