সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
মেহেরপুরে অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক | দুই দশকে আক্রান্ত প্রায় ৭ হাজার মানুষ, সংক্রমণ রোধে তৎপর আইইডিসিআর
মেহেরপুর জেলায় অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগের প্রাদুর্ভাব দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আক্রান্ত গবাদিপশুর মাংস খাওয়া এবং তা কাটাকুটির সময় অসাবধানতাবশত সংস্পর্শে এসে প্রতিনিয়ত সংক্রমিত হচ্ছেন নারী, পুরুষ ও শিশুরা। বছরের পর বছর ধরে এই রোগের প্রকোপ চললেও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির অভাব এবং অসচেতনতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। আক্রান্ত রোগীরা দীর্ঘমেয়াদি ও যন্ত্রণাদায়ক চর্মক্ষত নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, মেহেরপুরে ২০০৭ সালে প্রথম গাংনী উপজেলার কাজিপুর গ্রামে অ্যানথ্রাক্স রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে ধীরে ধীরে উপজেলার বাওট, কাজিপুর, মটমুড়া, সাহারবাটি ও বামন্দীসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। গত প্রায় দুই দশকে শুধুমাত্র গাংনী উপজেলাতেই প্রায় ৭ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে এ রোগে কোনো প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও আক্রান্তদের দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষত ও তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছে।
চলতি ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে মেহেরপুরে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬২ জনে। গত চার মাসে সন্দেহভাজন ৫৫ জনের নমুনা আইইডিসিআরে পাঠানো হলে ৪৫ জনের শরীরে এই ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। এছাড়া প্রায় দুই শতাধিক গবাদিপশুও সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। ইতিপূর্বে ২০১৩ সালে ১৯৯ জন, ২০১৪ সালে ২০৩ জন, ২০১৫ সালে ১৫৪ জন, ২০১৬ সালে ২৪০ জন, ২০১৭ সালে ২৮১ জন, ২০১৮ সালে ৪০৮ জন, ২০১৯ সালে ৬৬০ জন, ২০২০ সালে ৩৭৮ জন, ২০২১ সালে ৪১৭ জন, ২০২২ সালে ৬৪৪ জন, ২০২৩ সালে ৭৯৩ জন, ২০২৪ সালে ৬৮৬ জন এবং ২০২৫ সালে ৬৩৭ জন মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে চোরাই পথে আসা অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত গবাদিপশু কম দামে কিনে এনে জবাই করা হচ্ছে। সস্তা মাংসের লোভে সাধারণ মানুষ এই মাংস কিনছেন। মাংস প্রস্তুত ও রান্নার সময় গ্লাভস বা কোনো প্রকার সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার না করায় রোগটি মানুষের শরীরে দ্রুত সংক্রমিত হচ্ছে। প্রথমে আক্রান্ত স্থানে কালচে দাগ ও ফোস্কা পড়ে এবং পরে তা দগদগে ক্ষতে রূপ নেয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেছে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল। ডা. আরিফের নেতৃত্বে চার সদস্যের এই দলটি স্থানীয় পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ ও অ্যানথ্রাক্সের ধরন নির্ণয় করে রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করছেন। গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা একরামুল হক জানান, মেহেরপুরে মূলত 'স্কিন অ্যানথ্রাক্স' বা ত্বকের অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
গাংনী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোঃ আরিফুল ইসলাম বলেন, গাংনী উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই অ্যানথ্রাক্স প্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গবাদিপশুর টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং ইতিমধ্যে ৩০ হাজার পশুকে এই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।
মেহেরপুরের সিভিল সার্জন আবু সাঈদ জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ এড়াতে মাংস ক্রয়-বিক্রয়ের সময় সচেতন হতে হবে। মাংস কাটার সময় অবশ্যই হাতে প্রতিরক্ষামূলক গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।