বৃষ্টি উপেক্ষা করে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা
সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
ফুটবল বিশ্বকাপ | বৃষ্টি উপেক্ষা করে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা
ফুটবল বিশ্বকাপের আবহ শুরু হতেই সারা দেশের মতো কুষ্টিয়াতেও ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র ফুটবল উন্মাদনা। প্রিয় দলের প্রতি সমর্থন জানাতে এবং নিজেদের ভালোবাসার জানান দিতে নানা রকম ব্যতিক্রমী আয়োজনে মেতে উঠেছেন স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীরা। এরই ধারাবাহিকতায় কুষ্টিয়া শহরে বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে এক বর্ণাঢ্য ও বিশাল শোভাযাত্রা করেছেন আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা। আকাশি-সাদা রঙের পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুন, বেলুন আর ভুভুজেলার শব্দে এ সময় পুরো শহর উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকেল চারটায় কুষ্টিয়া পৌরসভা চত্বর থেকে 'আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব কুষ্টিয়া'র ব্যনারে এই শোভাযাত্রাটি বের করা হয়। দুপুরের পর থেকেই কুষ্টিয়ার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল এবং একপর্যায়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। তবে প্রতিকূল আবহাওয়াও দমাতে পারেনি ফুটবলপ্রেমীদের উচ্ছ্বাস। বৃষ্টির মধ্যেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন ও শহরের আনাচ-কানাচ থেকে শত শত আর্জেন্টিনা সমর্থক এসে পৌরসভা চত্বরে জড়ো হতে থাকেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমর্থকদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
পৌরসভা চত্বর থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও বাণিজ্যিক এলাকা প্রদক্ষিণ করে সিঙ্গার মোড়ে গিয়ে পৌঁছায়। পরে সেখান থেকে ঘুরে আবার শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অতিক্রম করে। শোভাযাত্রাটি যখন শহরের মূল সড়কগুলো দিয়ে যাচ্ছিল, তখন রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার ছোট ছোট মিছিল এসে মূল বহরে যোগ দেয়। এতে মুহূর্তের মধ্যেই মিছিলের পরিধি বিশাল আকার ধারণ করে এবং পুরো শহর যেন আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রঙে রঙিন হয়ে ওঠে।
শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ সমর্থকের পরনেই ছিল আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী আকাশি-সাদা জার্সি। অনেকের হাতে ছিল বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকা। কেউ বিশাল আকৃতির পতাকা কাঁধে নিয়ে হেঁটেছেন, কেউ আবার বেলুন উড়িয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। শোভাযাত্রার সামনে থাকা একটি পিকআপ ভ্যানে সাউন্ড সিস্টেম বাজিয়ে বিশ্বকাপের থিম সং ও জনপ্রিয় ফুটবল সংগীত সম্প্রচার করা হচ্ছিল। সেই সংগীতের তালে তালে নেচে-গেয়ে পুরো শহর উৎসবে ভাসিয়ে দেন সমর্থকেরা। বৃষ্টিভেজা এই উৎসবে তরুণ-তরুণী, কিশোর ও শিশুদের পাশাপাশি প্রবীণ সমর্থকদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
বৃষ্টির মধ্যে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের এমন ব্যতিক্রমী ও দৃষ্টিনন্দন আয়োজন দেখতে শহরের রাস্তার দুই পাশে সাধারণ মানুষের ব্যাপক ভিড় জমে যায়। পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এ সময় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। অনেকেই ফুটপাতে বা দোকানের নিচে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে সমর্থকদের উৎসাহ দেন। আবার অনেককেই দেখা যায় মুঠোফোনে এই আনন্দঘন মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে। শহরের প্রবীণ এক বাসিন্দা জানান, কুষ্টিয়ায় ফুটবলের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের, তবে বিশ্বকাপ এলে তরুণদের এই উন্মাদনা পুরো শহরকে নতুন প্রাণ দেয়।
আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব কুষ্টিয়ার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাপ নয়, বরং প্রাণের গভীর উচ্ছ্বাস ও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই সমর্থকেরা এই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন। এটি শুধু একটি সাধারণ মিছিল নয়, এটি আমাদের ফুটবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও যে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে এসেছেন, তা আমাদের অভিভূত করেছে।’ তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন, আর্জেন্টিনা এবারও বিশ্বসেরা হবে। একই সঙ্গে তিনি স্বপ্ন দেখেন, একদিন বাংলাদেশ ফুটবল দলও বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নিজেদের অবস্থান তৈরি করবে। হার-জিত যাই হোক না কেন, ফুটবলের মাধ্যমে সম্প্রীতি ও উৎসবের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই তাঁদের মূল লক্ষ্য।
আয়োজক কমিটির সদস্যরা জানান, তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও অন্যান্য সামাজিক ব্যাধি থেকে দূরে রেখে মাঠমুখী করা এবং খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই ধরনের উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য।
বৃষ্টিস্নাত বিকেলে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের এই আনন্দমিছিল কুষ্টিয়ার সাধারণ মানুষের মনে অন্যরকম এক আবহ তৈরি করেছে। প্রতিকূল আবহাওয়া বা ঝড়-বৃষ্টি যে বাঙালির ফুটবল উন্মাদনাকে দমাতে পারে না, কুষ্টিয়ার এই উৎসবমুখর পরিবেশ যেন আরও একবার সেটিই প্রমাণ করল। দিনশেষে ফুটবল যে শুধু একটি খেলা নয়, বরং কোটি মানুষের আবেগ ও উৎসবের এক অনন্য নাম, তা কুষ্টিয়াবাসী প্রত্যক্ষ করল।