সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
জামায়াত ও কওমিপন্থীদের দীর্ঘদিনের দূরত্ব | বিরোধের গোড়াপত্তন ও রাজনৈতিক সমীকরণ
বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির পরিমণ্ডলে জামায়াতে ইসলামী ও কওমি ধারার আলেমদের মধ্যকার দ্বিমুখী সম্পর্ক বেশ প্রাচীন ও জটিল। সম্প্রতি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল মালেকের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই দীর্ঘদিনের দূরত্ব পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। এক ধর্মীয় মাহফিলে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়াকে তিনি 'গোমরাহি' বলে অভিহিত করেন। কওমি ধারার আলেম এবং উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠান মারকাযুদ দাওয়াহর শিক্ষাসচিব হিসেবে তাঁর এই বক্তব্যে আলেম সমাজের একাংশের পুঞ্জীভূত অস্বস্তিরই প্রতিফলন ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যদিও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা গেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা মামুনুল হক—যিনি জামায়াতের সঙ্গে জোটে রয়েছেন—স্পষ্ট করেছেন যে মাওলানা আবদুল মালেক স্বনামধন্য আলেম হলেও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি কারও রাজনৈতিক শিষ্যত্ব গ্রহণ করেননি।
এদিকে, হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে সাতটি কওমিভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ করার যে উদ্যোগ চলছে, সেখানে জামায়াত জোটে থাকা দুটি দল যুক্ত থাকায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। কওমি আলেমদের একাংশের মতে, তাঁদের বিরোধ শুধুই রাজনৈতিক নয়, বরং ধর্মীয় আকিদাগত। এমনকি পূর্বে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদির চিন্তাধারা এবং জামায়াতের আকিদা নিয়ে হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকেও কড়া সমালোচনা এসেছে, যার জবাবে জামায়াত নেতৃত্বও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত ও কওমি ঘরানার এই টানাপোড়েনের পেছনে মূল তিনটি কারণ সক্রিয়: ধর্মীয় বিশ্বাস বা আকিদার দ্বন্দ্বে মূল ব্যাখ্যা, ধর্মীয় কর্তৃত্ব বা নেতৃত্বের লড়াই এবং ঐতিহাসিক অবিশ্বাসের ক্ষত।
সূচনা ঘরের ভেতর থেকেই
এই বৈরিতার শুরু জামায়াতের অভ্যন্তরীণ পটভূমি থেকেই। ১৯৪১ সালে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠার সময় দেওবন্দি ঘরানার বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট আলেম দলটিতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পরই দলটির প্রতিষ্ঠাতা নায়েবে আমির মাওলানা মনজুর নোমানি এবং প্রথম মজলিসে শুরার সদস্য আবুল হাসান আলী নদভি দল ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে মনজুর নোমানি তাঁর গ্রন্থে এবং আলী নদভি তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন যে, মাওলানা মওদুদির কিছু ধর্মীয় মতামত, সাহাবিদের নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সঙ্গে তাঁরা একমত হতে পারেননি।
বাংলাদেশেও লালবাগ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী শুরুতে জামায়াতকে সমর্থন করলেও পরবর্তীতে মওদুদির চিন্তাধারার সমালোচনা করে 'ভুল সংশোধন' শীর্ষক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে ১৯৫১ সালের ৩ আগস্ট দেওবন্দি প্রবীণ আলেমরা এক যৌথ ফতোয়ায় জামায়াত ও মওদুদির কিছু মতবাদকে 'আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদার পরিপন্থী' বলে অভিহিত করেন। তাঁদের প্রধান তিনটি অভিযোগ ছিল—সাহাবিদের সমালোচনা, নামাজের মতো ইবাদতকে রাষ্ট্রের ট্রেনিং হিসেবে দেখা এবং নবীদের নিষ্পাপতার ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক।
ধর্মীয় কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব ও ঐতিহাসিক প্রভাব
কওমি আলেমদের কাছে ধর্মীয় ব্যাখ্যার কর্তৃত্ব প্রাতিষ্ঠানিক সনদপ্রাপ্ত আলেমদের হাতে থাকাই স্বাভাবিক নিয়মানুগ বিষয়। তবে জামায়াত মূলত সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ও ক্যাডারভিত্তিক আধুনিক কাঠামোয় বিশ্বাসী নেতাকর্মীদের মাধ্যমে নিজেদের আদর্শিক প্রভাব বাড়াতে চেয়েছে, যা প্রথাগত আলেমদের সাথে নেতৃত্বের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করেছে।
এছাড়া, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর কেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহ দুটি ধারার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে বৈরি সম্পর্কের মধ্যেও সত্তরের দশক থেকে পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন ও ক্ষমতার প্রয়োজনে জামায়াত ও কওমিভিত্তিক দলগুলোকে জোটবদ্ধ হতেও দেখা গেছে। কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তরুণ প্রজন্মের কওমি শিক্ষা অর্জনকারীদের একটি অংশের জামায়াতে যোগদানের প্রবণতা প্রবীণ কওমি আলেমদের পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হতে উদ্বুদ্ধ করছে।
রাজনৈতিক সমীকরণের স্বার্থে দুই পক্ষ কখনো এক মঞ্চে আসলেও আকিদাগত মৌলিক পার্থক্য এবং ঐতিহাসিক সংশয় দূর না হলে কওমি ও জামায়াতের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক প্রাচীর পুরোপুরি ভেঙে পড়া কঠিন বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।