২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

রমাযানের শেষ দশক; লাইলাতুল কদর ও ই’তিকাফ

প্রতিনিধি :
ইমদাদুল হক
আপডেট :
মে ৩, ২০২১
12
বার খবরটি পড়া হয়েছে
শেয়ার :
| ছবি : 

মাওলানা ইমদাদুল হক

রমাযানের শেষ দশকের ফযীলত:

রমাযান মাস যেমন বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় অধিক ফযীলতপূর্ণ তেমনি রমাযানের শেষ দশক বাকি দুই দশকের তুলনায় ফযীলতপূর্ণ। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দশকে ইবাদতে সর্বাধিক মনোনিবেশ করতেন। হাদীস শরীফে এসেছে, আয়িশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমাযানে এত বেশি ইবাদতে মনোনিবেশ করতেন যা অন্য সময়ে করতেন না এবং রমাযানের শেষ দশকে এত বেশি মনোনিবেশ করতেন যা এর বাইরে করতেন না (জামিউল উসূল ৬/১১৪)।

আয়িশা (রা.) অন্য বর্ণনায় বলেন, রমাযানের শেষ দশক আসলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাত্রি জাগরণ করতেন, পরিবারের লোকদেরকে জাগিয়ে দিতেন এবং সকল কিছু পরিহার করে ইবাদতে পরিপূর্ণ মনোনিবেশ করতেন (সহীহ বুখারি, হাদীস-২০২৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৭৪; সুনান আবু দাউদ, হাদীস-১৩৭৬)।

এছাড়া অন্যান্য সাহাবি থেকেও এ দশকের ফযীলতে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। উম্মু সালামা (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমাযানের শেষ দশকে পরিবারের রাত্রি জাগরণে সক্ষম সকল সদস্যকে জাগিয়ে দিতেন (নাইলুল আওতার ৪/৩২০)।

আলী (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমাযানের শেষ দশকে পরিবারের সকল সদস্যকে (ইবাদতের জন্য) জাগিয়ে দিতেন (সুনান তিরমিযি, হাদীস-৭৯৫)।

লাইলাতুল কদরের ফযীলত:

রমাযানের শেষ দশকের ফযীলতের একটি কারণে এ দশকে লাইলাতুল কদর রয়েছে। আগের যুগের মানুষেরা দীর্ঘ আয়ু লাভ করতেন। সে তুলনায় এ উম্মাতের আয়ু অনেক কম। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভাবলেন, এ কারণে তারা দীর্ঘ হায়াতের কারণে যত আমল করতে পারত এ উম্মাত তো আমলে সে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে না। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁকে লাইলাতুল কদর দান করলেন, যা হাজার মাস থেকে উত্তম (মুআত্তা মালিক, হাদীস-৮৮৯)।

মহান আল্লাহ বলেন, আমি এই কুরআন নাযিল করেছি কদরের রাতে। আপনি জানেন কি, লাইলাতুল কদর কী? কদরের রাত হাজার মাস থেকেও উত্তম। এ রাতে ফেরেশতামণ্ডলী ও রূহ অবতীর্ণ হন প্রত্যেক কাজের জন্য তাঁদের রবের নির্দেশে। শান্তি-- তা ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে (সূরা কদর, আয়াত: ১-৫)।

হাদীস শরীফে এসেছে, আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,  রমাযান মাসে একটি রাত রয়েছে, যা হাজার মাস থেকে উত্তম, যে তার কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল সে প্রকৃতই বঞ্চিত হল (সুনান নাসায়ি, হাদীস-২১০৬; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস-৭১৪৮)।

আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কদরের রাতে ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে ইবাদতে রত থাকে তার পূর্বের পাপরাশি ক্ষমা করে দেওয়া হয় (সহীহ বুখারি, হাদীস-১৯০১; সহীহ মুসলিম, হাদীস-৭৬০)।

লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান:

লাইলাতুল কদর রমাযানের একটি রাত, যা শেষ দশকে রয়েছে। কিন্তু কুরআন-হাদীস এ রাতকে নির্ধারণ করে জানিয়ে দেয় নি। এ রাত যথাযথভাবে ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাতে পারলে পাপরাশি ক্ষমা হয়, হাজার মাস ইবাদতের চেয়ে বেশি ফযীলত লাভ হয়। আর এ রাত থেকে বঞ্চিত হলে সে প্রকৃত হতভাগা বলে গণ্য হয়। তাই আমাদের উচিত, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ রাতকে অনুসন্ধান করা। শেষ দশকের সকল রাতেই সর্বসাধ্য দিয়ে ইবাদত-বন্দেগি করা।

কিন্তু আমরা তা করি না। একটি নির্দিষ্ট রাতে (২৭-এর রাতে) কিছু নামায-কালাম করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটি করা অপছন্দ করতেন। এতে হয়তো আমরা এ মহিমান্বিত রাতকে হারিয়ে ফেলি, হয়তো বা আমাদের নাম লেখা হয় ‘হতভাগাদের’ তালিকায়। এজন্য আমাদের কর্তব্য, সকল ক্ষেত্রের মতো এক্ষেত্রেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশনার অনুসরণ করা।

ইবন উমার (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কেউ যদি লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে চায় সে যেন শেষ দশকের রাতগুলোতে অনুসন্ধান করে (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৬৫)।

তিনি আরো বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা শেষ দশ রাতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করবে। কেউ যদি একান্তই দুর্বল হয় তবে সে শেষ সাত রাতের ব্যাপারে অন্তত দুর্বলতা প্রকাশ করবে না (মুসনাদ আহমাদ, হাদীস-৫৪৮৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৬৫)।

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছিল, কিন্তু ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরা শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে তা খোঁজ করবে (সহীহ বুখারি, হাদীস-২০২৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৬৭)।

সুতরাং কদর রাতের ফযীলত প্রত্যাশীর উচিত এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশনা মোতাবেক অনুসন্ধান জারি রাখা। উপরন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কদরের রাতকে অনুসন্ধানের জন্য শুধু এক রাতকে নির্দিষ্ট করে নেওয়াকে অপছন্দ করতেন।

আব্দুল্লাহ ইবন উনাইস (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, কোন রাতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে হবে? তিনি বলেন, লোকেরা শুধু ওই এক রাত ছাড়া বাকি রাতগুলোতে সালাত পরিত্যাগ করবে, এ আশঙ্কা না করলে আমি তোমাকে সে রাতের কথা বলতাম (মাজমাউয যাওয়ায়িদ ৩/১৭৮)।

শেষ দশকের ই’তিকাফ:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লাইলাতুল কদর ও শেষ দশকের ফযীলত লাভের জন্য শেষ দশক পুরোটা মসজিদে ই’তিকাফ করতেন। এবং তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁর স্ত্রীগণ ই’তিকাফ করতেন (সহীহ বুখারি, হাদীস-২০২৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস-১১৭২)।

আয়িশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমাযানের শেষ দশকে মসজিদে ই’তিকাফ করতেন এবং বলতেন, তোমরা রমাযানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো (সহীহ বুখারি, হাদীস-২০২০; সুনান তিরমিযি, হাদীস-৭৯২)।

উম্মু সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম বছর প্রথম দশকে ই’তিকাফ করেন, তারপর মধ্য দশকে ই’তিকাফ করেন, তারপর শেষ দশকে ই’তিকাফ করেন এবং বলেন, আমি এই দশকে লাইলাতুল কদর দেখেছি, তারপর আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। উম্মু সালামা (রা.) তারপর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি শেষ দশকে ই’তিকাফ করেন (তাবারানি, আল মু’জামুল কাবীর ২৩/৪১২)।

উপরের হাদীস দুটি থেকে অনুমিত হয়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমাযানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করতেন লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানের জন্য। তবে স্বতন্ত্র ইবাদত হিসাবেও ই’তিকাফের অনেক ফযীলত রয়েছে। ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন ই’তিকাফ করবে মহান আল্লাহ তার ও জাহান্নামের মাঝে তিন পরিখা সমান দূরত্ব তৈরি করে দেবেন, প্রত্যেক পরিখার প্রশস্ততা দুই দিগন্তের চেয়েও বেশি (মাজমাউয যাওয়ায়িদ ৮/১৯২)।

সুতরাং আমাদের কর্তব্য রমাযান মাসের শেষ দশকে বিশেষভাবে ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা। সম্ভব হলে ই’তিকাফ করা। না-হলে অন্তত যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করতে থাকা। কিন্তু আমরা এর বিপরীত করি--  শেষ দশকে ঈদের প্রস্তুতির নামে কেনাকাটাসহ নানান অনর্থক ও অশ্লীল কাজকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ি। রমযানের শেষ সময়ে আমাদের মনে রাখতে হবে, হাদীস শরীফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি রমাযান পেয়েও তার গুনাহ মাফ করাতে পারল না সে ধ্বংস হোক’ (মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস-৭২৫৬)।

সর্বশেষ খবর
menu-circlecross-circle linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram