২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১৫ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

বায়ান্নোত্তর ৭০ বছর ; প্রাসঙ্গিক ভাবনা

প্রতিনিধি :
শরিফুল ইসলাম রোকন
আপডেট :
ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২২
14
বার খবরটি পড়া হয়েছে
শেয়ার :
earthquake in Cyprus
| ছবি : earthquake in Cyprus


রহমান মুকুল : ভাষা আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে এসেছে আমাদের স্বাধীকার, আমাদের স্বাধীনতা। ভাষা আন্দোলনই ছিল স্বাধীনতার্জনের প্রথম সোপান। এ কথা আজ সর্বজন স্বীকৃত। ভাষা আন্দোলন শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, রাজনৈতিক প্রভাবও ছিল সুদুর প্রসারি। ভাষা আন্দোলনের প্রভাব বায়ান্নোত্তরকালে ব্যাপক রূপ লাভ করে। ‘৫৪’র নির্বাচন, ‘৫৬’র সংবিধান, ‘৬৬’র ছয় দফা, ‘৬৯’র গণ আন্দোলন, ‘৭০’র নির্বাচন, ‘৭১’র মুক্তিযোদ্ধসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম ও নীতিমালায় ভাষা আন্দোলনের অবদান অনস্বীকার্য। এ প্রসঙ্গে আহমদ ছফা বলেন,“গোড়ার দিকে এ আন্দোলন শিক্ষিত নবগঠিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির ছাত্র-তরুনদের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলেও একে বাংলার অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সাংগ্রামের চৌমহনা বলা যায়।” যে স্বাধীনতার বীজ বায়ান্নোতে রোপিত হয়েছিল, তার ভ্রæণ আলো হওয়ায় বেড়ে উঠার জন্য ৭ মার্চ বাইরে বের হওয়ার অবকাশ খুঁজেছিল।

এরপরও রক্তঝরা- অশ্রæঝরা দীর্ঘ ১৬ দিন পর ২৩ মার্চ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পাকিস্তান দিবস পালিত হয়েছিল। তাহলে কি স্বাধীনতা ডাক হিসেবে ৭ মার্চ প্রশ্নবিদ্ধ হয় না ? এর অনেক আগেই মজলুম জননেতা ভাসানী তো সাফ জবাব দিয়েছিলেন পাকিস্তানী শাসকদের আসসালামু আলাইকুম।


প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব : স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল মুলত: সময়ের দাবী। সময়ই এদেশবাসীর করনীয় নির্ধারণ করেছিল। পক্ষান্তরে, ভাষা আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। তখন ভাষা সৈনিকদের উপেক্ষা করতে হয়েছিল বৈরী সমাজ ও সময়ের ভ্রæকুটিকে। স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন দেশের সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছিল, ভাষা আন্দোলনে কিন্তু তেমনটি ঘটেনি। উচ্চ শিক্ষিত শ্রেণি ছাড়া তখন ভাষা আন্দোলনের মর্মার্থ কেউ অনুধাবন করতে পারতো না। তাছাড়া সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের প্রতি ছিল দেশবাসীর অকুন্ঠ সমর্থন, অকৃত্রিম দরদ। এহেন কষ্টার্জিত ভাষা আন্দোলনকে কোনক্রমেই ক্ষুদ্র পরিসরে দেখার অবকাশ নেয়। অথচ এই অমর ভাষা আন্দোলন, এই অমর একুশ কি আমরা যথার্থ মর্যাদায় পালন করছি? প্রশ্ন বিদগ্ধদের নিকট, যাদের ক্রমাগত উন্নাসিকতায় আমরা সরীসৃপে পরিণত হচ্ছি।


আমাদের স্বাতন্ত্র্য, আমাদের জাতীয়তা : আমরা বাংলাদেশী বলে গর্ববদ করি। পৃথিবীতে আরও অনেক দেশ আছে। সেসব দেশে একাধিক ভাষাও আছে। কিন্তু অন্যান্য দেশবাসী তাদের মাতৃভাষা মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের মত বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়নি। এক্ষেত্রে পৃথিবীতে আমরাই স্বাতন্ত্র্যের দাবীদার। একারনে আমরা বাংলাদেশীরা অন্যান্য দেশবাসী এমনকি পশ্চিম বাংলার বাংলা ভাষাভাষির থেকেও আলাদা। আরও একাধিক ক্ষেত্রে আমরা স্বতন্ত্র্য। আমাদের যদি বাঙ্গালী বলতেই হয়, তাহলে আমরা বাংলাদেশী বাঙ্গালী। যারা শুধু ভাষা দিয়ে জাতীয়তা বিচার করতে চায়, তারা চাতুয্যের আশ্রয় নেন। তাছাড়া বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ তো একটা সাম্প্রদায়িক চেতনাচ্ছন্ন মতবাদ। এই চরম সম্প্রদায়িক মতবাদ বাংলাদেশের সংবিধানে সন্নিবেশিত করে সংবিধানকেই করা হয়েছে কলংকিত। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ মুলত উনবিংশ শতাব্দীর উগ্র হিন্দু সম্প্রদায়িক বাঙ্গালী মতবাদেরই নামান্তর।

এ মতবাদে মুসলমান, নি¤œবর্ণের হিন্দু, আদিবাসী, বৌদ্ধ-খৃষ্টানদের কোন স্থান নেই। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে ভারতের তৎকালীন প্রখ্যাত রাজনীতিক শ্রী বসন্ত চ্যাটার্জি তার “ইনসাইড বাংলাদেশ টুডে” প্রন্থে লিখেছেন “ইংরেজদের বদান্যতায় ও আধুনিক শিক্ষার সংস্পর্শে যে নতুন অভিজাত শ্রেণির ক্রমশ উদ্ভব হয়, তারাই বাঙ্গালী হিসেবে পরিচিতি পাবে। এদেরকে সাধারণ কথায় ভদ্রলোক বলা হয়ে থাকে। নীচ ভারতীয় কোন সর্বনামবাদী হিন্দু, উপজাতি বা কোন মুসলমান অথবা নামীয় জাতির কোন সদস্য কখনো বাঙ্গালী বলে বিবেচিত হতে পারে না। তা সে যত স্বাভাবিকভাবেই এই ভাষাটিতে কথা বলুক না কেন, অথবা তার সামাজিক মর্যাদা বা শিক্ষা যাই হোক না কেন।” (পৃ:১৪৫-১৫৭) উনবিংশ শতাব্দীর এধরনের উগ্র সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনা সংবিধানে সন্নিবেশিত করার মধ্যদিয়ে মুলত সাম্প্রদায়িকতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের ঘাড়ে। এ প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহার বলেন “ অবাক লাগছে লড়াই করে যে জাতি নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করলেন, সেই জাতি পরে অন্যান্য জাতির ( প্রায় ৯০% মুসলমানসহ বৌদ্ধ, খৃষ্টান ও উপজাতি) অধিকার হরণ করল। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে এই নগ্ন বর্ণবাদী সংবিধানের উপর দাঁড়িয়ে।” (বন ও বনের অধিবাসী পৃ:নং ৩)


সাংস্কৃতিক আগ্রাসন : আমাদের সহ¯্র বছরের ঐতিহ্য আছে। ইতিহাসে আমাদের যোদ্ধাজাতি, সাংগ্রামীজাতি সর্বপরি মহৎজাতি হিসেবে পরিচিতি আছে। আমাদের নিজস্ব একটা সংস্কৃতি আছে। বাংলাদেশী সংস্কৃতি। কিন্তু তা আজ অপসংস্কৃতি গ্রাস করছে। গাঙ্গেয় বা গাঙ্গেত্রীর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে। মেঘনা-যমুনার বুক দিয়ে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে আমাদের সাংস্কুতিক মুখপাত্র রেডিও ও টেলিভিশন মুখথুবড়ে পড়েছে। পক্ষান্তরে ডিস এন্টিনার বদৌলতে ভারতীয় বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলর প্রতি মানুষ অত্যধিক আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। এই চ্যানেলগুলোতে ভারতীয় সমাজ- সংস্কৃতিই উপজীব্য হিসেবে দেখানো হয়। সংগত কারনেই আমাদের যুবসমাজ যৌনতা, সন্ত্রাস, দেবদাসী, কামোৎসব ও বহুঈশ্বরবাদ জাতীয় সংস্কৃতির দিকে বিপদজনকভাবে উৎসাহী হয়ে উঠেছে। নতুন প্রজন্ম ভুলতে বসেছে তাদের স্বর্ণগর্ভ ইতিহাস। তারা বিস্মৃত হচ্ছে পূর্বসূরীর অর্ধসহ¯্র বছরের উপমহাদেশ শাসনের দীর্ঘ সৌকর্যময় ইতিহাস।


প্রয়োজন শেকড় সন্ধ্যানের : বিশ্ব এখন চলছে শেকড় সন্ধ্যানের পালা। অথচ আমাদের বর্তমান প্রজন্ম আজ শেকড় থেকে বিচ্যুত। শেকড়-মুলহীন মহীরুহ তাড়াতাড়ি ভূপাতিত হয়। আমাদের অবস্থাও অনুরূপ হতে চলেছে। এখনই দরকার শক্তভাবে শেকড়-মুল আন্তরিকভাবে অলিঙ্গনের। বর্তমান ও উত্তর প্রজন্মকে দেশজ করে গড়ে তুলতে এর বিকল্প নেই। এই অমর একুশে আজ সর্বাগ্রে একথা স্মরণ থাকা প্রয়োজন।


শেষ অনুরোধ : যে দেশমাতৃকার সূর্যসন্তানেরা মায়ের মর্যাদা, মায়ের ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বুকের তাজারক্ত অকাতরে ঢেলে দিতে দ্বিধা করে না, সে মায়ের কিসের এত লজ্জা, এত শোক ? কেন তার মাথা আজও অবনত ? আমাদের জাতীয় আশা, অহংকার, গৌরব ও বীরত্বের প্রতীক শহীদ মিনার। যথার্থ কর্তৃপক্ষের নিকট আমাদের অনুরোধ ----- শহীদ মিনারের অবনত মাথা সমোন্নত করা হোক। দেশমাতার গর্বিত শীর চিরোন্নত হোক। এটাই আমাদের অমর একুশের একান্ত প্রার্থনা।

সর্বশেষ খবর
menu-circlecross-circle linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram