সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে | জাতীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত?
সরকার শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার ১৫ বছরের দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দিয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠনসহ বিভিন্ন মহলের আপত্তি ও প্রতিবাদ উপেক্ষা করেই এই চুক্তি সম্পন্ন করা হয়। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কতটা সুনিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে?
সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেখানো হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক অপারেটরের অন্তর্ভুক্তির ফলে টার্মিনালের পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, আধুনিক প্রযুক্তি প্রবেশ করবে এবং পণ্য খালাস ও পরিবহনের গতিও বাড়বে। চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রথম ১০ বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে এবং বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউস কনটেইনার পরিচালনা করবে। এই টার্মিনালের আয় থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পাবে, এর বাইরে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার একটি নির্দিষ্ট ফি দেওয়ারও কথা রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে এই শর্তগুলো বেশ আশাব্যঞ্জক মনে হলেও, বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বন্দরের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। বন্দরে পণ্য খালাসে সময়ক্ষেপণ কমলে ব্যবসায়িক খরচ হ্রাস পাবে, রপ্তানিকারকেরা উপকৃত হবেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও বৃদ্ধি পেতে পারে।
কিন্তু উন্নয়নের এই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব ফলাফল কতটা সঙ্গতিপূর্ণ হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। চুক্তির আর্থিক শর্তগুলোর স্বচ্ছতা, সরকারের আয় নির্ধারণের পদ্ধতি, বিনিয়োগের অর্থ, এর সময়সীমা এবং বাস্তবায়নের তদারকির ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী, এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে জরিমানার শর্তগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং ১৫ বছরের এই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষায় কী ধরনের নিশ্চয়তা রয়েছে, তা নিয়েও স্পষ্ট ধারণা প্রয়োজন।
বন্দর কেবল একটি ব্যবসায়িক অবকাঠামো নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত নিরাপত্তারও অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই বিদেশি অপারেটরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, জবাবদিহি এবং নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধীদের আশঙ্কাগুলোকে নিছক রাজনৈতিক আপত্তি হিসেবে না দেখে তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে সেগুলোর যৌক্তিক জবাব দেওয়া উচিত।
সরকার জানিয়েছে যে, এনসিটিতে কর্মরত কোনো শ্রমিক চাকরি হারাবেন না বা তাঁদের বেতন-ভাতাও কমবে না। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায়ও পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া আবশ্যক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং এর বাস্তবায়ন ও আর্থিক ফলাফলের তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা। এই চুক্তি যেন রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত সুফল বয়ে আনে, কোনো বিশেষ পক্ষের জন্য অস্বচ্ছ সুবিধা অর্জনের মাধ্যম না হয়।
বিদেশি বিনিয়োগে কোনো সমস্যা নেই, তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে এমন নিশ্চয়তা সবসময় থাকে না। শেষ পর্যন্ত বিচার্য হবে, এই চুক্তি দেশের অর্থনীতিকে কতটা লাভবান করছে, জাতীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত রাখছে এবং জনগণের কাছে কতটা জবাবদিহি নিশ্চিত করছে। উন্নয়নের নামে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ কতটা রক্ষা পেল, তার জবাব সরকারকেই দিতে হবে।