সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
পিতার শেষকৃত্যেও অনুপস্থিত মোজতবা খামেনি | ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার আড়ালে থাকার কারণ কী?
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঐতিহাসিক জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামলেও, তার উত্তরসূরি ও নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে সেখানে দেখা যায়নি। তার এই অনুপস্থিতি মোজতবার শারীরিক অবস্থা, নিরাপত্তা এবং তিনি আসলে দেশ পরিচালনা করছেন কিনা, এমন নানা প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে।
তেহরানের বিশাল মোসাল্লা মসজিদে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসা জনতার ভিড়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঝাপসা ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল। ভিডিওতে এক ধর্মীয় পোশাক পরিহিত ব্যক্তিকে বারান্দা থেকে অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, তিনিই মোজতবা খামেনি। তবে পরে ইরানি আলেম রেজা মুসাভি ওয়ায়েজ নিশ্চিত করেন, ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিটি তিনি নিজেই। ফলে মোজতবার উপস্থিতির এই গুঞ্জনও মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
হামলার পর থেকেই জনসমক্ষে নেই
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় আলি খামেনিসহ দেশটির কয়েক ডজন শীর্ষ নেতা ও সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছিলেন। একই হামলায় খামেনির স্ত্রী এবং মোজতবার স্ত্রীও প্রাণ হারান। তবে ওই হামলায় মোজতবা খামেনি প্রাণে বেঁচে গেলেও আহত হয়েছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়। এরপর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। শুধুমাত্র লিখিত বিবৃতির মাধ্যমেই তিনি সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তার কোনো ভিডিও বা কণ্ঠবার্তা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে, ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তিনি পুরোপুরি সুস্থ আছেন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের আলোচনাসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলোতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
খামেনির জানাজার আগে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন, মোজতবা খামেনিও এখন “মৃত্যুর লক্ষ্যবস্তু”। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইরান বিশেষজ্ঞ মোহসেন মিলানি জানান, যুদ্ধের সময় ইরানের গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে মোজতবার প্রকাশ্যে আসা তাকে হত্যাচেষ্টার ঝুঁকিতে ফেলতে পারতো। এতে শুধু নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা এবং ভবিষ্যৎ সংঘাত মোকাবিলাও জটিল হয়ে যেত।
গুঞ্জন আরও জোরালো
পিতার জানাজা ও দাফনে অনুপস্থিত থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কিছু ভিডিওতে দাবি করা হয়, ছদ্মবেশে সাধারণ মানুষের ভিড়ে উপস্থিত ছিলেন মোজতবা খামেনি। আবার কেউ কেউ দাড়িবিহীন, কালো টুপি পরা এক ব্যক্তির ছবি ছড়িয়ে দাবি করছেন, তিনিই নতুন সর্বোচ্চ নেতা।
এদিকে, খামেনিকে দাফনের আগে শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া অনেক সমর্থক ‘মোজতবা, আমরা আপনার সেবায় প্রস্তুত’ এমন স্লোগানও দেন। কিন্তু ছয় দিনব্যাপী শোকানুষ্ঠানের কোথাও মোজতবাকে দেখা যায়নি। এমনকি বাবার দাফনের সময়ও তিনি তার ভাই মোস্তফা, মাসউদ ও মেইসামের পাশে উপস্থিত ছিলেন না। মোজতবার অনুপস্থিতিকে কটাক্ষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ইরাকে খামেনির শোকমিছিলে নতুন সর্বোচ্চ নেতার পোস্টার বহনকারীদের ছবি প্রকাশ করে তারা ব্যঙ্গ করে লিখে, ‘বাবার জানাজায় ইরাকে মোজতবার আবেগঘন উপস্থিতি।’
গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, মোজতবা খামেনি তার বাবার তুলনায় ‘আরও বাস্তববাদী’। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা জীবিত থাকলেও গুরুতর আহত হয়েছেন। তবে ইরানের চিকিৎসা কর্মকর্তারা দাবি করেন, হামলায় তিনি গুরুতর আহত হননি। এদিকে গত মে মাসে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে বলা হয়, ইরানের যুদ্ধকৌশল নির্ধারণে মোজতবা খামেনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
বিরোধীদের প্রশ্ন, ক্ষমতার ভেতরেও অস্বস্তি
বিশ্লেষকদের মতে, জানাজায় মোজতবার অনুপস্থিতি ইরানের বিরোধীদের মধ্যে এই ধারণা আরও শক্তিশালী করতে পারে যে তিনি কার্যত অক্ষম অথবা কেবল প্রতীকী নেতা। অন্যদিকে, ইরানের সরকারপন্থী মহলেও তার অনুপস্থিতি নানা প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনাকে ঘিরে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ আরও প্রকাশ্যে আসতে পারে। ইতোমধ্যেই কিছু রক্ষণশীল গোষ্ঠী অভিযোগ তুলেছে, পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনা চালানো কর্মকর্তারা নাকি মোজতবা খামেনির নির্দেশ অমান্য করছেন। এমনকি জানাজার শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের দিকে পাথরও নিক্ষেপ করা হয়।
আড়াল থেকেই নেতৃত্ব?
বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা খামেনির জনসমক্ষে না আসা ছিল একটি পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত। এতে তাকে সম্ভাব্য হামলা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে এবং একই সঙ্গে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাও বজায় রাখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংকট নিরসন সংস্থার ইরানবিষয়ক পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, সর্বোচ্চ নেতার প্রধান দায়িত্ব এখন পর্দার আড়াল থেকে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও সম্ভাব্য পারমাণবিক সমঝোতা এগিয়ে নেওয়া। তার ভাষায়, জনসমক্ষে না থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে তিনি জবাবদিহিতার বাইরে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি আছেন— তাত্ত্বিকভাবে কিংবা বাস্তবভাবে।