সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
ইরানের বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে রেজা পাহলভির স্বপ্ন ফিকে | রয়টার্স
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পুত্র রেজা পাহলভিকে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে তেহরানের সংঘাত শুরুর পর অনেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিকল্প নেতা হিসেবে দেখছিলেন। তবে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সেই সম্ভাবনা অনেকটাই কমে এসেছে।
রয়টার্সের এক গভীর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, প্রায় পাঁচ দশক ধরে নিজ দেশের বাইরে অবস্থান করা সত্ত্বেও রেজা পাহলভি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপজুড়ে সক্রিয়ভাবে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। তিনি বিভিন্ন জনসভা ও সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, তহবিল সংগ্রহ করেন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেন।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ লিখেছিলেন, "ইরানের জনগণ আমাকে বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতনের পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। আমি সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।"
গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে আয়োজিত কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্সে (সিপ্যাক) রেজা পাহলভি ট্রাম্প সমর্থকদের কাছ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা লাভ করেন। এই সম্মেলনে উপস্থিত ডনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক এবং বিপুল সংখ্যক ইরানি-আমেরিকানরা প্রায় ৪৫ সেকেন্ড ধরে দাঁড়িয়ে তাকে করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানান। সেসময় অনেকের হাতেই ইরানের বিপ্লব-পূর্ব পতাকা দেখা যায়।
তবে মাত্র চার দিন পরেই তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, "আমরা ইরানকে ধ্বংস করছি, বা যেমনটা বলা হয়, পাথর যুগে ফিরিয়ে দিচ্ছি।" ট্রাম্পের এই মন্তব্যে বহু প্রবাসী ইরানি ক্ষুব্ধ হন। রেজা পাহলভির কয়েকজন অর্থিক পৃষ্ঠপোষকও অত্যন্ত হতাশ হয়েছিলেন, কারণ তারা আশা করেছিলেন পাহলভি দ্রুত ট্রাম্পের এই মন্তব্যের নিন্দা জানাবেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেজা পাহলভি নিজেকে ইরানের সম্ভাব্য বিকল্প নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করলেও তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানায়নি।
জানুয়ারিতে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, "রেজা পাহলভিকে একজন ভালো মানুষ বলেই মনে হয়, কিন্তু নিজের দেশে তিনি কতটা গ্রহণযোগ্য, তা আমি জানি না।" পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট করে বলেন যে, "মার্কিন প্রেসিডেন্ট কখনোই বলেননি যে রেজা পাহলভিকে ইরানের নতুন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই তাদের লক্ষ্য।"
রয়টার্সের সূত্রমতে, রেজা পাহলভির কিছু আর্থিক সমর্থক একটি ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তার নেতৃত্ব নিয়ে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, তিনি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্রিত করতে পারেননি এবং তার কট্টরপন্থি সমর্থকদের দ্বারা ভিন্নমতাবলম্বী অন্যান্য ইরানিদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনাগুলোতে পর্যাপ্ত কঠোর পদক্ষেপ নেননি।
তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এসব সহিংস ঘটনায় রেজা পাহলভির সরাসরি জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ মেলেনি। রয়টার্সকে দেওয়া দুটি পৃথক সাক্ষাৎকারে রেজা পাহলভি দাবি করেন যে, ইরানের বর্তমান সরকার "পতনের খুব কাছাকাছি।"
তিনি আরও বলেন, "৪৬ বছর আগে ইরানকে মুক্ত করার যে আন্দোলন আমি শুরু করেছিলাম, তা কখনোই আমার ব্যক্তিগত ক্ষমতার জন্য ছিল না। এটি ইরানি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য।" নিজের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমি গন্তব্য নই, আমি শুধুমাত্র সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর একটি সেতু।"
রয়টার্স জানিয়েছে, রেজা পাহলভির প্রধান পরিচয় হলো তিনি ইরানের শেষ শাহের পুত্র। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা অথবা পোল্যান্ডের লেখ ভালেসার মতো দেশের অভ্যন্তরে তার কোনো সুসংগঠিত গণআন্দোলন নেই।
এতদসত্ত্বেও, নেদারল্যান্ডসভিত্তিক গামান রিসার্চ ইনস্টিটিউট কর্তৃক পরিচালিত সাম্প্রতিক একটি অনলাইন জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী ৩১ হাজার ৪৫০ জন ইরানির মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ রেজা পাহলভিকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন।
রয়টার্সের তদন্তে যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া এবং কানাডায় রেজা পাহলভির কতিপয় সমর্থকের বিরুদ্ধে হামলা, ভীতিপ্রদর্শন ও হয়রানির একাধিক ঘটনার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে লন্ডনে একজন কুর্দি সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ, ভিয়েনায় একজন ইরানি রেস্তোরাঁ মালিককে হুমকি এবং নেদারল্যান্ডসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানিদের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে রেজা পাহলভি রয়টার্সকে বলেন, "আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই। আমি নিজেকে এই সব ঘটনা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন রাখছি। যারা অপরাধ করেছে, তাদের আইনের মুখোমুখি হওয়া উচিত।"
রয়টার্সের প্রতিবেদন আরও জানায় যে, ইরানে সরকার পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে প্রচারণা চালালেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও তেহরানের বর্তমান সরকারের সঙ্গেই কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রেখেছে।
রেজা পাহলভির মতে, "ইরানের জনগণকে কোনো কূটনৈতিক সমঝোতার 'ঘুঁটি' হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। তাদের সংগ্রাম স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য।" তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন এখনও ইরানে সরকার পরিবর্তনকে নিজেদের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেনি।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
ইরানে পুনরায় সামরিক হামলার ইঙ্গিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের, সর্বাত্মক জবাবের হুঁশিয়ারি তেহরানের
৮ ঘন্টা আগে
ভ্যানিটি ফেয়ারের অনুসন্ধানে নতুন মোড়
১২ ঘন্টা আগে
রিয়াদের বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলায় ২ বাংলাদেশি নিহত, আহত ২৪; বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ
১ সপ্তাহ আগে