কুষ্টিয়া কোর্ট রেল স্টেশন জরাজীর্ণ অবস্থায় দুইটি বইয়ের দোকান
সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
রেলপথে কি তবে ফুরালো বইয়ের সুবাস? | হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বুক স্টল
ব্রিটিশ শাসনামলে যখন ভারতীয় উপমহাদেশে রেলপথের বিস্তার ঘটে, তখন থেকেই 'ভ্রমণকালীন পাঠ' বা 'রিডিং অন দ্য মুভ' ধারণাটি প্রবর্তিত হয়। তৎকালীন ব্রিটিশ চিন্তাবিদদের উদ্দেশ্য ছিল ট্রেনের দীর্ঘ একঘেয়েমি কাটাতে বই ও সাময়িকীকে যাত্রীদের শ্রেষ্ঠ সঙ্গী করে তোলা। এই ভাবনা থেকেই প্ল্যাটফর্মে হুইলারের মতো ঐতিহ্যবাহী বুক স্টলগুলোর যাত্রা শুরু। এই স্টলগুলো তখন ছিল আভিজাত্যের প্রতীক এবং রুচিশীল মানুষের আড্ডাস্থল। তবে কালের বিবর্তনে বাংলাদেশের সেই গৌরবময় ঐতিহ্য আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
বর্তমানে দেশের অধিকাংশ প্ল্যাটফর্মের বুক স্টল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যে দু-একটি টিকে আছে, সেখানেও রয়েছে নানা সংকট। প্লাটফর্মের বুকস্টলে একটি বই হাতে নিয়ে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফারি তামান্না রুহি বলেন, "প্লাটফর্মের বুক স্টলগুলি সকল স্টেশনে দেখা যায় না। আবার দুয়েকটি প্লাটফর্মে বুকস্টল থাকলেও ভালো মানের বই পাওয়া যায় না।" তার এই বক্তব্যে বর্তমান প্রজন্মের পাঠকদের অতৃপ্তি এবং স্টলগুলোর গুণগত মানের অবনতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশনের প্লাটফর্মের বুকস্টলের বিক্রেতা টোটনের সঙ্গে কথা বলে এই সংকটের আরও এক বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। তিনি জানান, বর্তমানে বই, শিশুদের খেলনা ও অন্যান্য সামগ্রী মিলিয়ে প্রতিদিন এক হাজার থেকে এক হাজার দুইশত টাকার মতো বিক্রি হয়, যা থেকে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা লাভ থাকে। এই সামান্য আয়ে সংসার চালানো ও ব্যাবসার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এক সময় যেখানে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আর লিটল ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ চোখে পড়ত, সেখানে এখন হকারদের শোরগোল আর প্লাস্টিকের খেলনা বা চানাচুরের দোকানের আধিপত্য।
এই পতনের পেছনে প্রযুক্তির আগ্রাসন, স্মার্টফোনের জয়জয়কার এবং রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। লাইসেন্স নবায়নের জটিলতা, উচ্চ ভাড়া এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের নামে পুরোনো নান্দনিক স্টলগুলো ভেঙে ফেলায় বিক্রেতারা ব্যাবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। বুক স্টলগুলো হারিয়ে যাওয়া মানে একটি ব্যাবসা বন্ধ হওয়া নয়, বরং এটি আমাদের সমাজ থেকে একটি মননশীল সংস্কৃতির অপমৃত্যু। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে আগামীর রেল ভ্রমণ হবে কেবল যান্ত্রিক, যেখানে থাকবে না কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক সুবাস।