সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে নিহত ১০ শ্রমিকের পরিবার পেলেন ক্ষতিপূরণ, ৯ দিনে প্রক্রিয়া সম্পন্ন
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মর্মান্তিক জাহাজভাঙা দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ১০ শ্রমিকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রক্রিয়াটি দুর্ঘটনার মাত্র নয় দিনের মধ্যেই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার নিবিড় তত্ত্বাবধানে গত রবিবার (২৩ আগস্ট) নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের কাছে ক্ষতিপূরণের অবশিষ্ট অর্থ এবং সরকারি মানবিক সহায়তার চেক হস্তান্তর করা হয়।
গত ১৪ আগস্ট, সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে ‘এমটি রাসি’ নামক একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক থেকে আকস্মিকভাবে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস নির্গত হওয়ায় বেশ কয়েকজন শ্রমিক আক্রান্ত হন। এই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নয়জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় এবং পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যান, যা মোট মৃতের সংখ্যা দশ-এ দাঁড়ায়।
নিহত শ্রমিকদের পরিবারের কাছে ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তরের জন্য বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) ইয়ার্ড প্রাঙ্গণে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক উল্লেখ করেন, "মানব জীবনের মূল্য অপরিসীম, এর কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়। তবুও, পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারানোর পর যেন কোনো পরিবারকে চরম অর্থকষ্টে পড়তে না হয় বা কারো কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাততে না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে দ্রুত আর্থিক সহায়তা প্রদান অপরিহার্য।"
দুর্ঘটনার পর পরই আহত শ্রমিকদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে তিনি আহত শ্রমিক ও তাদের স্বজনদের সাথে কথা বলেন এবং চিকিৎসকদের কাছ থেকে তাদের শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত খোঁজখবর নেন। জেলা প্রশাসক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের নির্দেশ দেন যেন আহতদের চিকিৎসায় কোনো ধরনের ঘাটতি না থাকে। গুরুতর আহত দুই শ্রমিককে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় প্রেরণ করা হয়। জেলা প্রশাসন হাসপাতাল প্রশাসন, ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ এবং জাহাজভাঙা শিল্প মালিকদের সংগঠনের সাথে চিকিৎসার বিষয়ে নিবিড় সমন্বয় রক্ষা করে। একইসাথে, নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা প্রদানের উদ্যোগও নেন তিনি। সে সময় চট্টগ্রামে অবস্থানরত অর্থমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিএসবিআরএ-এর নেতৃবৃন্দ এবং ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা করেন জেলা প্রশাসক।
পরবর্তীতে, বিএসবিআরএ এবং ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ নিহত প্রতিটি শ্রমিকের পরিবারের জন্য ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে। এই ঘোষিত ১০ লাখ টাকার মধ্যে, দুর্ঘটনার পরপরই পরিবারগুলোকে প্রাথমিকভাবে এক লাখ টাকা করে প্রদান করা হয়েছিল। শিল্পনীতির বিধি অনুযায়ী, আরও দুই লাখ টাকা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। আজকের অনুষ্ঠানে অবশিষ্ট সাত লাখ টাকার চেক পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
উপরন্তু, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা অনুসারে, সীতাকুণ্ডে বসবাসকারী পাঁচজন নিহত শ্রমিকের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ ২৫ হাজার টাকা করে মানবিক সহায়তা প্রদান করা হয়। অবশিষ্ট পাঁচটি পরিবার তাদের নিজ নিজ স্থায়ী ঠিকানার সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন কার্যালয় থেকে একই পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে।
জেলা প্রশাসন কর্তৃক প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী নিহত শ্রমিকেরা হলেন: পাবনার সুজানগরের মো. আবদুল আলিম সুজন (৩৬), জামালপুরের ইসলামপুরের হাবিবুর রহমান (৫২), চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর মো. মনছুর (৫৬), মো. নাসির উদ্দিন (৫১) ও পলাশ দাশ (৩৯), দক্ষিণ সোনাইছড়ির মতিউর রহমান (১৭), মির্জানগর জেলেপাড়ার সানি দাশ (২০), গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের মো. খোকন মিয়া (২৩), গাইবান্ধা সদরের মো. রানা মিয়া (২৩) এবং জামালপুর সদরের মো. ইদ্রিস আলী (৫০)। নিহত শ্রমিকদের বয়স ১৭ থেকে ৫৬ বছরের মধ্যে ছিল। তাঁদের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ছাড়াও পাবনা, জামালপুর এবং গাইবান্ধা জেলায়। তাঁদের স্ত্রী, মা অথবা বাবা, অর্থাৎ নিকটতম উত্তরাধিকারীকে ক্ষতিপূরণের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরও জানান, আহত শ্রমিকদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে। যদি তাঁদের অন্য কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে, তবে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষকে সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এবং জেলা প্রশাসন এই বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদারকি করবে।
মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জোর দিয়ে বলেন, "আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো জাহাজভাঙা শিল্পে 'জিরো ক্যাজুয়ালটি' বা শূন্য প্রাণহানি অর্জন করা। এই শিল্পকে টিকে থাকতে হবে, তবে একইসাথে এখানে কর্মরত শ্রমিকদের জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অতীব জরুরি।"
তিনি উল্লেখ করেন যে, এই দুর্ঘটনাটি হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের কারণে সংঘটিত হয়েছে। গ্যাসটি তাৎক্ষণিকভাবে এবং নিরাপদে অপসারণের জন্য ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ছিল না, এমনকি স্থানীয় বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদের কাছেও এই ধরনের প্রযুক্তি অনুপস্থিত ছিল। জেলা প্রশাসক বিশেষ করে এলএনজি এবং অন্যান্য গ্যাসবাহী জাহাজ কেনা ও কাটার সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বিষাক্ত গ্যাস শনাক্তকরণ এবং নিরাপদে অপসারণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন চৌধুরী নিহত শ্রমিকদের অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং শিল্পে নিযুক্ত সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জোরালো আহ্বান জানান। ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি নিহত শ্রমিকদের পরিবারের পাশে থাকার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।