আলমডাঙ্গা পৌর ভোটপূর্ব রাজনীতির হালচিত্র সংগঠনের জোর বনাম অনৈক্যের বোঝা
আলমডাঙ্গা পৌর ভোটপূর্ব রাজনীতির হালচিত্র সংগঠনের জোর বনাম অনৈক্যের বোঝা
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ এখনো পুরোপুরি ঠান্ডা হয়নি। এরই মধ্যে আলমডাঙ্গায় শুরু হয়ে গেছে পৌরসভা নির্বাচন ঘিরে নীরব প্রস্তুতি, হিসাব–নিকাশ আর কৌশলের রাজনীতি। শহরের প্রধান সড়ক, অলিগলি, চায়ের দোকান, দলীয় কার্যালয়—সবখানেই এখন একটাই আলোচনা: কে নামছে মেয়র পদে, আর কার জয়ের সম্ভাবনা কতটা?
জামায়াতের আগাম মাঠে নামা:
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো পৌরসভা নির্বাচনেও সবচেয়ে গোছানো অবস্থানে থাকতে চায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি শুরু থেকেই আগাম কৌশলে বিশ্বাসী। সে কারণেই অন্য দলগুলোর আগে মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
দলীয় সূত্র বলছে, এই সপ্তাহেই জামায়াত তাদের মনোনীত মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করতে পারে। নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে না এলেও আলোচনার শীর্ষে আছেন নূর মোহাম্মদ টিপু। মাঠপর্যায়ে দায়িত্বশীল নেতারা ইতোমধ্যে তৎপর। সংগঠনের ভিত আরও শক্ত করতে ও ভোটারদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে নিয়মিত যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে দলটি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত আলমডাঙ্গা পৌর এলাকায় পেয়েছিল মোট ১১২৭২ ভোট। একই নির্বাচনে বিএনপির প্রাপ্ত ভোট ছিল ৮১১০। অর্থাৎ জামায়াত এগিয়ে ছিল ৩১৬২ ভোটের ব্যবধানে। এই সংখ্যাগুলোই এখন পৌর নির্বাচনের আগাম মানচিত্র এঁকে দিচ্ছে।
বিএনপির ভেতরের অস্বস্তি:
অন্যদিকে, বিএনপি এখনো দ্বিধা–দ্বন্দ্ব, বিভক্তিতে জর্জরিত। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর দলটি পুরোপুরি মাঠে ফিরতে পারেনি। আলমডাঙ্গায় বিএনপির একাধিক গ্রুপ থাকলেও পারস্পরিক বোঝাপড়া দুর্বল।
পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাঁদের মধ্যে আছেন—
সাবেক উপজেলা সভাপতি শহিদুল কাওনাইন টিলু ওস্তাদ, পৌর বিএনপির সভাপতি আজিজুর রহমান পিন্টু, সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান ওল্টু, এবং যুবদলের আহ্বায়ক মীর উজ্জ্বল।
এত প্রার্থীর ভিড়ে একক দলীয় প্রার্থী ঠিক করা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সব প্রার্থী আবার এক গ্রুপেরও নয়। দীর্ঘদিনের অনৈক্য, পারস্পরিক অবিশ্বাস আর তৃণমূলের বিভক্তি দলটির পথ আরও কঠিন করে তুলেছে। এমনকি আলমডাঙ্গার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত টিলু ওস্তাদের পক্ষেও এই বাস্তবতায় জয় ছিনিয়ে আনা সহজ হবে না—এমনটাই মনে করছেন অনেকেই।
দীর্ঘদিনের অভিভাবকরা অনুপস্থিত:
দীর্ঘদিন ধরে আলমডাঙ্গা পৌরসভা নির্বাচনে যারা ‘ডাকসাইটে অভিভাবক’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁরা এবারের নির্বাচনে মাঠে নেই। একাধিকবার মেয়র ছিলেন মীর মহিউদ্দিন, স্থানীয় বিএনপির বটবৃক্ষ হিসেবে পরিচিত, তিনি প্রয়াত। আরেক জনপ্রিয় সাবেক পৌর চেয়ারম্যান এম সবেদ আলী অসুস্থ। একাধিক বারের মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা হাসান কাদির গনু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজনীতি বা ভোটের মাঠে সক্রিয় নন। ফলে এবারের নির্বাচনে একেবারে নতুন বা অনকোরা প্রার্থীদের জয়জয়াকার।
ইমেজ সংকট ও বাস্তব রাজনীতি
আলমডাঙ্গা পৌর শহরে বিএনপি এখন ইমেজ সংকটে ভুগছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের হিসাব দেখলেই বোঝা যায়— বিএনপির ঘাটি হিসেবে পরিচিত এলাকায় সংগঠন, মাঠ আর জনসমর্থনে জামায়াত এই মুহূর্তে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে। ফলে জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে বিএনপির যেকোনো প্রার্থীর লড়াই কঠিন কল্পনা বলেই মনে হচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
বিএনপির সামনে এখন কী করণীয়:
রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, আলমডাঙ্গা পৌর নির্বাচনে বিএনপিকে বিজয়ী হতে হলে সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। এখনই কিছু কঠোর ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে মাঠে নামার আগেই দলটি পিছিয়ে পড়বে।
প্রথমত, বিএনপির নিজেদের ভেতরের বিভক্তি দ্রুত দূর করা সবচেয়ে জরুরি। একাধিক গ্রুপ রেখে নির্বাচনে নামলে ভোট ভাগ হবে—এই সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দলীয় নেতৃত্বকে এখনই বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়—এই বার্তা তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন দরকার। শিক্ষিত, গ্রহণযোগ্য, সৎ ও নির্লোভ নেতাদের খুঁজে বের করে তাঁদের হাতে বাস্তব নেতৃত্ব তুলে না দিলে সাধারণ ভোটারের আস্থা ফিরবে না। পুরোনো মুখ নয়, বরং সমাজে যাঁরা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মানুষ—তাঁদের সামনে আনতে হবে।
তৃতীয়ত, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। দলীয় পরিচয়ের আড়ালে কেউ যদি দখল, চাঁদাবাজি বা অনৈতিক কাজে জড়িত থাকে, তাহলে তাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় না দেওয়ার স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজন হলে এমন ব্যক্তিদের নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্তই বিএনপির জন্য হতে পারে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রথম ধাপ।
সবশেষে, বিএনপিকে বুঝতে হবে—এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি বিশ্বাস ফেরানোর যুদ্ধ। এখনই যদি দল নিজেদের ঘর গোছাতে না পারে, তাহলে সংগঠিত প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়ানো বিএনপির জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
নির্বাচনের দিকনির্দেশনা এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি জানিয়েছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশের সব সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করা হয়। তখন প্রশাসক দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান চালানো হয়। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সময় পার করে দলীয় সরকারের প্রতিনিধিরা দায়িত্বে আছেন। ফলে নতুন নির্বাচনের দাবি এখন সময়ের বাস্তবতা।
সব মিলিয়ে আলমডাঙ্গা পৌর নির্বাচন শুধু একটি স্থানীয় ভোট নয়; এটি হয়ে উঠছে সংগঠন বনাম বিভক্তি, প্রস্তুতি বনাম দ্বিধার লড়াই। একদিকে, গোছানো জামায়াত, অন্যদিকে, ক্ষতবিক্ষত বিএনপি—এই সমীকরণ বদলাতে হলে বিএনপিকে দ্রুত ঐক্যের পথে ফিরতে হবে। নইলে পৌর নির্বাচনের ফল আগেই অনেকটা লেখা হয়ে যেতে পারে—এমনটাই বলছে আলমডাঙ্গার রাজনৈতিক হাওয়া।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
আলমডাঙ্গায় উপজেলা ও পৌর জামায়াতের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
১৯ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গায় ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে যুবক নিহত: সংঘর্ষের খবর শুনে স্টোক করে বৃদ্ধের মৃত্যু
৩ দিন আগে
আলমডাঙ্গা উপজেলার সর্বস্তরের জনগণকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী দারুস সালাম
৪ দিন আগে