সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
বিদ্যুৎ সংকট | অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিকশা ও চুলায় বাড়ছে অর্থনীতির চাপ, কোথায় সমাধান?
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ বিতরণ ও চাহিদার ক্ষেত্রে এক নতুন এবং জটিল বাস্তবতা দেখা দিয়েছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে ওঠা ৫০ থেকে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলার অস্বাভাবিক ব্যবহার দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। একসময় দিনের বেলায় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা বা ‘পিক আওয়ার’ তৈরি হলেও, এখন মধ্যরাতেই চাহিদা শীর্ষে উঠছে।
শুধুমাত্র ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দিতেই মধ্যরাতে অতিরিক্ত ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে, যার ফলে ‘অফ-পিক’ সময়ের কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে। বিদ্যুতের এই অস্বাভাবিক নৈশকালীন চাহিদা মেটাতে বাধ্য হয়ে সরকারকে উচ্চমূল্যের জ্বালানি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখতে হচ্ছে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২৫ টাকারও বেশি খরচ হওয়ায় রাষ্ট্রের ওপর বিপুল আর্থিক বোঝা চেপে বসছে। অন্যদিকে, বাসাবাড়িতে দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট এবং এলপিজি সিলিন্ডারের চড়া দামের কারণে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ পরিবার বাধ্য হয়ে ইনফ্রারেড বা ইনডাকশন চুলা ব্যবহার করছে। এর ফলে দিনে আরও প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, কাগজে-কলমে ‘পিক’ ও ‘অফ-পিক’ শব্দের উল্লেখ থাকলেও বাস্তব ক্ষেত্রে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ খাতের সঠিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রকট হচ্ছে, অন্যদিকে টেকসই ও বিকল্প প্রযুক্তি গ্রহণে আমাদের উদাসীনতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এটা অনস্বীকার্য যে ব্যাটারিচালিত রিকশা দেশের লাখ লাখ মানুষের জীবিকার অবলম্বন এবং সুলভ যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তাই রাতারাতি এগুলো বন্ধ করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি তাদের অপরিকল্পিতভাবে চলতে দেওয়াও চরম আত্মঘাতী হবে।
তবে এই গভীর সংকটের মধ্যেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ রিকশাতেই বর্তমানে পুরোনো প্রযুক্তির ‘লিড-অ্যাসিড’ ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়, যা ধীরগতির এবং অধিক বিদ্যুৎ অপচয়কারী। বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন, এসব রিকশায় আধুনিক ও দীর্ঘস্থায়ী ‘লিথিয়াম-আয়ন’ ব্যাটারি প্রতিস্থাপন করা গেলে বিদ্যুৎ খরচ এক ধাক্কায় বহুলাংশে কমে আসবে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করে ‘নেট মিটারিং’ ও স্মার্ট প্রযুক্তির সাহায্যে উল্টো অবশিষ্ট চার্জ জাতীয় গ্রিডে ফেরত দেওয়া সম্ভব। এই রূপান্তর বড় পরিসরে বাস্তবায়িত হলে বছরে দেশের প্রায় ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতের এই চ্যালেঞ্জকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে সরকারকে অবিলম্বে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, রিকশার সুনির্দিষ্ট নিবন্ধন নিশ্চিত করে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির বদলে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির রূপান্তরে চালক ও গ্যারেজ মালিকদের জন্য প্রণোদনা বা সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গ্যারেজগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া এবং অফ-পিক আওয়ারে স্মার্ট গ্রিড সংযোগ জোরদার করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বৈদ্যুতিক চুলার ওপর চাপ কমবে। সঠিক নীতি ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এ সংকটের সমাধান করা না গেলে দেশের বিদ্যুৎ খাত ও অর্থনীতির ওপর চাপ ক্রমেই বাড়বে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।