সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
এলপিজির দাম সমন্বয় হোক, তবে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে নয়
দৈনন্দিন বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া এখন আর সাধারণ মানুষকে চমকে দেয় না। তবে সব পণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সমান হয় না। পোশাক বা নির্দিষ্ট কিছু ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়লে ভোক্তা ব্যবহার কমিয়ে বা বিকল্প খুঁজে নিতে পারেন। কিন্তু রান্নার গ্যাস এমন একটি জরুরি উপাদান, যা বর্জন করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে যেসব নগরাঞ্চলে পাইপলাইনের সুবিধা নেই, সেখানে এলপিজি সিলিন্ডার কোনো বিলাসপণ্য নয়; বরং দৈনন্দিন রান্নার প্রধান ও একমাত্র অবলম্বন।
এমতাবস্থায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম আরও ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে, যা ২ নভেম্বর রাত ৮টা থেকে কার্যকর করা হয়। এর ঠিক এক মাস আগেই অক্টোবরের জন্য সিলিন্ডারপ্রতি ২৫২ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে এলপিজির দাম মোট ৪৭৫ টাকা বাড়ল।
আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে এলপিজির আমদানিনির্ভরতার যুক্তি অমূলক নয়। বিইআরসির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, আমদানিকৃত পণ্য হওয়ায় জাহাজের ভাড়া, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ও সিলিন্ডারজাতকরণ খরচের ওপর এর মূল্য নির্ভরশীল। ২০২৬ সালের এপ্রিলেও ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা থেকে এক ধাক্কায় ১ হাজার ৭২৮ টাকায় উন্নীত করা হয়েছিল, যার অল্প কয়েক দিন পরেই তা দাঁড়িয়েছিল ১ হাজার ৯৪০ টাকায়। সুতরাং বৈশ্বিক বাজার পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে মূল্য সমন্বয় ঘটা একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
তবে মূল প্রশ্ন তৈরি হয় অন্য জায়গায়—আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাতে দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে হঠাৎ কমিশন বা চার্জ বাড়ানো কতটা যুক্তিসঙ্গত? নতুন মূল্য কাঠামোতে দেখা যায়, ১২ কেজি সিলিন্ডারের আমদানিকারকের চার্জ ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৮১ টাকা ৭৬ পয়সা, ডিলারের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করা হয়েছে। যার পুরো আর্থিক বোঝা চাপানো হয়েছে প্রান্তিক ভোক্তাদের ওপর, যাদের আয় একই অনুপাতে বাড়ে না।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যে বাজারে সিলিন্ডার কিনতে না পারার দীর্ঘদিনের পুরোনো সমস্যা। অক্টোবরে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বহু স্থানে ভোক্তাদের ২০০ থেকে ৫০০ টাকা অতিরিক্ত গুণতে হয়েছে। ফলে কাগজকলমে দাম যেটাই নির্ধারণ করা হোক না কেন, বাজার চলে নিজস্ব অসাধু প্রক্রিয়ায়। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির চরম দুর্বলতাই ফুটে ওঠে।
একটি পরিবারের নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে রান্নার গ্যাসের মূল্য বারবার বাড়ানো হলে সামাজিক ও আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। রাষ্ট্র যখন বাজেট এবং রাজস্ব আয়ের হিসাব মেলায়, তখন সাধারণ নাগরিকের রান্নাঘরের বাজেট সামলানোর অক্ষমতার দিকটি উপেক্ষা করা সমীচীন নয়। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পাশাপাশি প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজার মনিটরিংয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
লেখক: ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস।