বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল ওয়ালপেপার দ্য গার্ল উইথ দ্য নো নোজ-পিন
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে ইন্টারনেটের অ্যাক্সেস যখন এক বিলাসিতা ছিল, আর মোবাইল ফোন মানেই ছিল নকিয়া বা স্যামসাংয়ের ‘সিম্বিয়ান’ কিংবা ‘জাভা’ হ্যান্ডসেট—ঠিক সেই সময়ে একটি ছবি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রতিটি মাল্টিমিডিয়া মোবাইলে জায়গা করে নিয়েছিল। নাকে ঐতিহ্যবাহী নোলক এবং মাথায় রঙিন ওড়না জড়ানো এক তরুণীর সেই স্নিগ্ধ প্রতিকৃতি আজও অনেকের মনে নস্টালজিয়া তৈরি করে। দীর্ঘ দুই দশক ধরে ছবিটি কখনো ‘নিশু’, কখনো ‘সুইটি’, আবার কখনো ভুলবশত ‘মালালা ইউসুফজাই’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু কে এই রহস্যময়ী তরুণী?
২০০৬-২০০৭ সালের দিকে বাংলাদেশে যখন ইন্টারনেটের গতি ছিল মন্থর এবং ডেটা প্যাক ছিল ব্যয়বহুল, তখন সাধারণ মানুষের বিনোদনের প্রধান উৎস ছিল ‘মোবাইল রিচার্জের দোকান’। সেখানে অল্প টাকার বিনিময়ে মেমোরি কার্ডে গান, ভিডিও এবং ওয়ালপেপার লোড করা হতো। গবেষণায় দেখা যায়, এই ছবিটি মূলত Mobile9.com নামক একটি আন্তর্জাতিক মোবাইল কন্টেন্ট প্ল্যাটফর্মে ‘বিউটিফুল পাকিস্তানি গার্ল’ বা ‘এশীয় সুন্দরী’ ট্যাগ দিয়ে আপলোড করা হয়েছিল।
সে সময় ব্লুটুথ এবং ইনফ্রারেড প্রযুক্তির মাধ্যমে ছবিটি এক ফোন থেকে অন্য ফোনে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রচার ছাড়াই এটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল ‘অফলাইন ভাইরাল’ ওয়ালপেপার।
বাংলাদেশে ছবিটি নিয়ে প্রচলিত সবচেয়ে বড় লোকগাথা বা আরবান লিজেন্ড হলো মেয়েটির নাম ‘নিশু’ বা ‘সুইটি’। অনেকের দাবি ছিল, মেয়েটি পাকিস্তানের কোনো এক মফস্বল শহরের বাসিন্দা এবং পরবর্তীতে কোনো এক দুর্ঘটনায় তিনি মারা গেছেন। তবে ছবির ফরেনসিক এবং প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর প্রকৃত উৎস অনেক বেশি পেশাদার।
প্রকৃতপক্ষে, এই তরুণীর চেহারার সাথে ২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউডের সমালোচক-ধন্য চলচ্চিত্র ‘ডোর’ (Dor)-এর কেন্দ্রীয় অভিনেত্রী আয়েশা তাকিয়া (Ayesha Takia)-র অবিশ্বাস্য সাদৃশ্য রয়েছে। ছবিটির পোশাক, নাকে পরা সেই নোলক এবং ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল আয়েশা তাকিয়ার সেই সময়কার ফটোশুটের শৈলীর সাথে মিলে যায়। তবে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বাংলাদেশে ছবিটি ‘অজ্ঞাত সুন্দরী’ হিসেবেই তার জনপ্রিয়তা ধরে রাখে এবং মানুষের কল্পনাপ্রসূত পরিচয়ে পরিচিত হয়।
২০১২ সালের পর যখন পাকিস্তানি শিক্ষা অধিকার কর্মী মালালা ইউসুফজাই এবং মার্কিন ড্রোন হামলার শিকার নাবিলা রেহমান বিশ্বজুড়ে পরিচিত হন, তখন এই পুরোনো ছবিটি নিয়ে নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি হয় । কিছু মহল থেকে ইন্টারনেটে দাবি করা শুরু হয় যে, ছবিতে থাকা এই স্নিগ্ধ চেহারার মেয়েটিই মালালা বা নাবিলা ।
ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মালালা ও নাবিলার পোশাকের ধরন এবং দক্ষিণ এশীয় চেহারার বৈশিষ্ট্যের সাথে মিল থাকায় এই বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে । কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে এই ছবিটি যখন সবার মোবাইলে মোবাইলে ঘুরত, তখন মালালা কিংবা নাবিলা কেউই বৈশ্বিক পরিচিতি পাননি। এটি মূলত দক্ষিণ এশীয় রক্ষণশীল এবং ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে মালালার ভাবমূর্তিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার একটি টুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ।
এই ছবিটি কেবল একটি ওয়ালপেপার ছিল না, বরং তা ছিল বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের ডিজিটাল নাগরিকদের ‘কালেক্টিভ মেমোরি’ বা সম্মিলিত স্মৃতির অংশ। নাকে নোলক বা নাকফুলের সেই অলঙ্করণটি তৎকালীন গ্রাম ও শহরের ফ্যাশন ট্রেন্ডে বড় প্রভাব ফেলেছিল ।
আজকের যুগে যেখানে মুহূর্তেই কোনো কিছুর পরিচয় বের করা সম্ভব, সেখানে ২০ বছর আগে ভাইরাল হওয়া এই ছবিটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় এমন এক সময়ের কথা, যখন কোনো ছবির সৌন্দর্যই ছিল তার একমাত্র পরিচয়, নাম কিংবা পরিচয় সেখানে গৌণ ছিল।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
আভিজাত্য থেকে গভীর অনুরাগ: জেনে নিন চুম্বনের বৈচিত্র্য ও ইতিহাস
১৪ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গায় বুনিয়াদের উদ্যোগে স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর
৪ দিন আগে
আলমডাঙ্গা ব্যায়ামাগারের উদ্যোগে শরীরচর্চার পাশাপাশি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও বনভোজন অনুষ্ঠিত
৬ দিন আগে