সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
পঞ্চগড়ের সীমান্ত থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন | প্রাকৃতিক বিস্ময়ের নানাদিক ও ভ্রমণ নির্দেশিকা
হেমন্তের এক স্নিগ্ধ প্রভাতে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় মহানন্দা নদীর তীরে জড়ো হন অনেক প্রকৃতিপ্রেমী। ওপারে ভারতের ভূখণ্ড, আর তার ওপর সকালে রোদ ফুটতেই দূর উত্তরের আকাশে ভেসে ওঠে শুভ্র এক পর্বতমালা। ভোরের সূর্যের স্পর্শে বরফঢাকা সেই চূড়াগুলো কখনো গোলাপি, কখনো সোনালি, আবার কখনো উজ্জ্বল সাদা রূপ ধারণ করে। দৃশ্যটি দেখে মনে হয়, যেন নীল আকাশের বুকে বরফের এক বিশাল ক্যানভাস ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
প্রতিবছর এমন মনমুগ্ধকর অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক ছুটে যান তেঁতুলিয়ায়। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য—বাংলাদেশের ভূমিতে দাঁড়িয়ে বিশ্বের অন্যতম উঁচু পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা প্রত্যক্ষ করা। তবে প্রশ্ন ওঠে, সীমান্ত অতিক্রম না করেও এত দূর থেকে পর্বতটি কীভাবে দেখা যায়? আর হিমালয় ও কাঞ্চনজঙ্ঘার মধ্যে তফাতটাই বা কী?
ভৌগোলিক পরিভাষায় হিমালয় এবং কাঞ্চনজঙ্ঘা এক বিষয় নয়। হিমালয় হলো সমগ্র এশিয়া মহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত এক সুবিশাল পর্বতমালা। আর কাঞ্চনজঙ্ঘা হলো এই পর্বতমালাই অংশবিশেষ, যার প্রধান শৃঙ্গটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮ হাজার ৫৮৬ মিটার (প্রায় ২৮,১৬৯ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত। উচ্চতার দিক দিয়ে এভারেস্ট ও কে-টু-এর পরেই এর অবস্থান। এটি ভারত ও নেপালের সীমান্তে অবস্থিত একটি পর্বতগুচ্ছ, যার পাঁচটি বিশেষ চূড়া রয়েছে। মূলত তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার পুরো অবয়ব দেখা না গেলেও, কেবল উঁচু বরফাবৃত শীর্ষ অংশটিই প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হয়।
তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার আনুমানিক সরলরৈখিক দূরত্ব প্রায় ১৫০ কিলোমিটার। পৃথিবীর বক্রতা ও ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে পর্বতের তলদেশ দেখা যায় না। তবে অত্যন্ত উঁচুতে অবস্থান করায় স্বচ্ছ আবহাওয়ায় বাংলাদেশের উত্তর সীমান্ত থেকে এর বরফঢাকা শুভ্র চূড়া খালি চোখে স্পষ্ট ভেসে ওঠে।
বছরের নির্দিষ্ট সময়েই কেবল এটি দেখা যায়, যার মূল কারণ আবহাওয়া। বর্ষাকালে মেঘ ও জলীয় বাষ্পের কারণে আকাশ পরিষ্কার থাকে না। তবে শরৎ ও হেমন্তের মাঝামাঝি সময়ে (বিশেষ করে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত) বাতাসে মেঘ ও ধূলিকণার পরিমাণ কমে এলে কাঞ্চনজঙ্ঘা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এমনকি শীতের শুরুতে বা অক্টোবরের আগেই কখনও কখনও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এটি দেখা যেতে পারে। তবে শীতে অতিরিক্ত কুয়াশা থাকলে আবার পর্বত আড়ালে চলে যায়।
তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো ও মহানন্দা নদীর পাড় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থান হলেও বাংলাবান্ধা, শালবাহান এবং পঞ্চগড় জেলা শহরের করতোয়া সেতু থেকেও অনুকূল আবহাওয়ায় তা দেখা যায়। এছাড়া ঠাকুরগাঁও জেলার বুড়িরবাঁধসহ বেশ কিছু খোলা জায়গা থেকে এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে নীলফামারী বা দিনাজপুর থেকেও দূরবর্তী এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে অনেকের।
ভ্রমণপিপাসুদের জন্য ভোরের সূর্যোদয় কিংবা বিকেলের আলোর পরিবর্তনের সময়টি পর্বত দেখার জন্য সেরা মুহূর্ত। আবহাওয়া পরিবর্তনশীল হতে পারে বলে অন্তত দুই দিনের পরিকল্পনা নিয়ে তেঁতুলিয়া যাওয়া যুক্তিযুক্ত। স্থানীয় পর্যায়ে পর্যটন অবকাঠামো উন্নত করা, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং নির্ভরযোগ্য আবহাওয়া সংকেত দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা আরও সুন্দর হবে, যা অঞ্চলের অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।