সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
কুড়িগ্রামের উলিপুরে কোটি টাকার ভাওয়াইয়া ভবন | লোকসংগীতের ঐতিহ্য রক্ষায় নতুন অধ্যায়
উত্তরাঞ্চলের জনপ্রিয় লোকসংগীত ভাওয়াইয়ার ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে এর চর্চা প্রসারে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কুড়িগ্রামের উলিপুরে বাংলাদেশ ভাওয়াইয়া পরিষদের স্থায়ী বহুতল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এই ভবনটি সংগঠনটির দীর্ঘ ৩৩ বছরের সাধনাকে নতুন মাত্রা দেবে, যা এতদিন একটি সাধারণ টিনের চালাঘরে পরিচালিত হয়ে আসছিল।
শুক্রবার দুপুরে এই নতুন অধ্যায়ের শুভ সূচনা হয়। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপ, স্থানীয় প্রশাসন, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় এই মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। ১৯৪৩ সালে উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের পাঁচপীর এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ভাওয়াইয়া পরিষদ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে একটি সাদামাটা টিনের ঘরেই তাদের সকল কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল। এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও এই প্রতিষ্ঠান প্রায় তিন হাজার ভাওয়াইয়া শিল্পী তৈরি করেছে, যারা দেশ-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছেন।
ভাওয়াইয়া পরিষদের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও আধুনিক করতে স্থায়ী ভবন নির্মাণের এই পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়। স্থানীয় সমাজসেবী গেলাপ হোসেন পাঁচ শতক মূল্যবান জমি দান করেছেন ভবনটির জন্য। বসুন্ধরা গ্রুপ এই নির্মাণ প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য আর্থিক অনুদান দিয়েছে। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের সার্বিক সহায়তা এবং সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও এলাকাবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণে প্রকল্পটি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে শুক্রবার দুপুরে উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের পাঁচপীর এলাকায় কুড়িগ্রাম-চিলমারী সড়কের পাশে এক আলোচনা সভা ও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ ভাওয়াইয়া পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট প্রদীপ কুমার রায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও ভাওয়াইয়া একাডেমির পরিচালক ভুপতি ভূষণ বর্মা। অনুষ্ঠানটি সুন্দরভাবে সঞ্চালনা করেন বশীর আহমেদ।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন উলিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শওকত আলী, ভাওয়াইয়া পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রাজেন্দ্রনাথ রায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক হারুন অর রশিদ লাল, স্বনামধন্য সাহিত্যিক ও গীতিকার তৌহিদুর রহমান, কসিম উদ্দিন পরিষদের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মমিন এবং জমিদাতা গেলাপ উদ্দিনের সুযোগ্য পুত্র এনামুর রহমান। বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি খন্দকার একরামুল হক সম্রাট এবং নিউজ২৪-এর কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি হুমায়ুন কবীর সূর্য।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ভাওয়াইয়া গান উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, প্রকৃতি, প্রেম, বিরহ এবং সামগ্রিক লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ ভাওয়াইয়া পরিষদ এই অমূল্য ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে অসামান্য ভূমিকা পালন করছে। এই নতুন ভবন নির্মিত হলে সংগীতচর্চা, প্রশিক্ষণ এবং নতুন শিল্পী তৈরির কার্যক্রম আরও ব্যাপক ও সুসংগঠিত হবে। বক্তারা দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করেন যে, আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এই নতুন ভবন ভাওয়াইয়া সংগীতের প্রসারে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা উপযুক্ত পরিবেশে সাধনা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন, যা দেশের এই ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীতকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আরও সমৃদ্ধ করবে।