লগইন
খুলনা বিভাগে আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন, শুধু কি যশোরের সুবিধা?
বড় করে দেখুন
সাম্প্রতিকী ডেক্স আপডেট: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ | ১১:০১ দুপুর ১৫ বার পঠিত
ফন্ট সাইজ:

সংবাদ শুনুন

প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন

খুলনা বিভাগ
পদ্মা সেতু রেল | খুলনা বিভাগে আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন, শুধু কি যশোরের সুবিধা?

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন: পদ্মা সেতু নির্মাণের পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের সামনে নতুন যোগাযোগ সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল স্বপ্ন তুলে ধরা হয়েছিল। সড়ক ও রেল যোগাযোগের উন্নয়নের মাধ্যমে খুলনা বিভাগের সকল জেলার রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যাতায়াত সহজ হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে—এমনই ছিল প্রত্যাশা। কিন্তু পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ চালুর পর সেই প্রত্যাশার সুফল বণ্টনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে যশোরের রেল যোগাযোগ উন্নয়নের দাবিতে আন্দোলন এবং একসঙ্গে তিনটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর প্রস্তাবনা বৃহত্তর খুলনা বিভাগের রেলসেবায় আঞ্চলিক ভারসাম্যের বিষয়টি জোরালোভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

সম্প্রতি, 'বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি' বেনাপোল-যশোর-ঢাকা এবং দর্শনা-কোটচাঁদপুর-যশোর-ঢাকা রুটে একটি প্রভাতী ট্রেনসহ মোট তিনটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর দাবি জানিয়েছে। গত ২৭ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে প্রতীকী রেল অবরোধ করে রেলমন্ত্রী বরাবর ছয় দফা দাবিতে একটি স্মারকলিপিও জমা দেওয়া হয়। তাদের মূল দাবি হলো, বিদ্যমান যাতায়াত সময়সূচি এমন যে সকালে ঢাকায় পৌঁছে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে একই দিনে যশোরে ফিরে আসা বেশ কঠিন।

যাত্রীদের এই সমস্যার বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। তবে প্রশ্ন উঠছে, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন কি কেবল যশোরকেন্দ্রিক দাবির ভিত্তিতেই পরিচালিত হবে? খুলনা বিভাগের অন্য নয়টি জেলা—খুলনা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, মাগুরা, নড়াইল, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের—মানুষের রেলযাত্রার প্রয়োজন, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার বিষয়গুলো কি সমান গুরুত্ব পাবে না?

পদ্মা সেতুর সুফল নিয়ে কেন এক জেলার একক দাবি?

খুলনা বিভাগের যশোর ছাড়াও বাকি ৯টি জেলার মানুষেরও রাজধানী, বিভাগীয় শহর এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী রেল যোগাযোগের তীব্র প্রয়োজন রয়েছে। অথচ রেলসেবা, নতুন ট্রেন বরাদ্দ এবং যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের আলোচনায় সব জেলার চাহিদা সমানভাবে প্রাধান্য পায় না। যশোরের আন্দোলনকারীরা তিনটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেনের দাবি তুললেও, একই সময়ে অন্যান্য জেলার যাত্রীদের জন্য তেমন সমন্বিত আঞ্চলিক দাবি বা আলোচনা দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মেহেরপুরের মানুষের যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা কোনো অংশেই কম নয়। মাগুরা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের মতো জেলাগুলোতে রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের প্রশ্নও বহু পুরনো ও দীর্ঘদিনের।

ফলে একটি জেলার সংগঠিত আন্দোলন যেন সমগ্র অঞ্চলের রেল উন্নয়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। শুধু কোনো জেলা দাবি উত্থাপন করেছে বলেই সেই দাবি অগ্রাধিকার পাবে, আর অন্যান্য জেলার মানুষ সংগঠিত আন্দোলন করতে পারেনি বলে তাদের প্রয়োজন উপেক্ষিত থাকবে—এমন নীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বর্তমান রেল যোগাযোগের বাস্তব চিত্র

বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের আন্তঃনগর ট্রেনের সময়সূচি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খুলনা-রাজশাহী রুটের কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস যশোর, মোবারকগঞ্জ, কোটচাঁদপুর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ার বিভিন্ন স্টেশন হয়ে চলাচল করে। খুলনা-ঢাকা রুটের সুন্দরবন এক্সপ্রেসও যশোর, ঝিনাইদহের মোবারকগঞ্জ ও কোটচাঁদপুর, চুয়াডাঙ্গা এবং কুষ্টিয়া অঞ্চলের যাত্রীদের সেবা প্রদান করে। অন্যদিকে, নতুন জাহানাবাদ এক্সপ্রেস পদ্মা সেতু হয়ে খুলনা-ঢাকা রুটে নড়াইলের সিংগিয়া ও অন্যান্য স্টেশনের যাত্রীদের জন্য যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে।

অর্থাৎ, রেল যোগাযোগের বিদ্যমান নেটওয়ার্ক একাধিক জেলার মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। নতুন ট্রেন চালু বা সময়সূচি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসব রুটের সকল যাত্রীর সামগ্রিক চাহিদা বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।

যশোরের দাবির মধ্যে কেবল নতুন ট্রেন চালু নয়, সাধারণ বগি সংযোজন, কৃষিপণ্য পরিবহন, কম ভাড়ায় যাতায়াত এবং দর্শনা-খুলনা রুটে ডাবল লাইন নির্মাণের বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি দাবি শুধুমাত্র যশোরের জন্য নয়, বৃহত্তর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সীমান্ত বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং ডাবল লাইন নির্মাণ আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, নতুন কোচ ও ইঞ্জিনের সীমিত সক্ষমতার মধ্যে তিনটি নতুন ট্রেন চালুর দাবি বাস্তবায়ন করতে হলে কোন রুটে কত যাত্রী পাওয়া যাবে, কোন সময়সূচিতে সবচেয়ে বেশি মানুষ উপকৃত হবেন এবং কোন জেলায় রেলসেবা সম্প্রসারণের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি—এসব বিষয়ে কোনো সমন্বিত সমীক্ষা চালানো হয়েছে কি?

রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা জরুরি

পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ তৎকালীন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন—এমন রাজনৈতিক বক্তব্য বিভিন্ন সময়ে এসেছে। কিন্তু সেতু নির্মাণের কৃতিত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই বৃহৎ অবকাঠামোর সুফল কতটা সমানভাবে সকল জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে।

একটি বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের পর তার সুষ্ঠু ব্যবহার ও সুবিধা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে যশোরের মানুষ যেমন দাবি জানাতে পারেন, তেমনি খুলনা বিভাগের অন্য জেলার মানুষও সমান অধিকার রাখেন। কোনো জেলার দাবিকে খাটো করা যেমন উচিত নয়, তেমনি একটি জেলার দাবি পূরণ করতে গিয়ে অন্য জেলার প্রয়োজনকে উপেক্ষা করাও সমর্থনযোগ্য নয়।

রেলওয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক প্রভাব, আঞ্চলিক পরিচয় কিংবা কোনো সংগঠনের আন্দোলনের শক্তির চেয়ে যাত্রীসংখ্যা, সম্ভাব্য আয়, সামাজিক প্রয়োজনীয়তা, অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং যোগাযোগবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বাস্তব পরিস্থিতিকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

আঞ্চলিক সমন্বয়ের অভাব কোথায়?

খুলনা বিভাগের ১০টি জেলার জন্য একটি সমন্বিত রেল যোগাযোগ পরিকল্পনা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। কোন জেলায় প্রতিদিন কত যাত্রী রেলপথ ব্যবহার করেন, কোথায় টিকিটের চাহিদা বেশি, কোন রুটে ট্রেনের আসনসংকট রয়েছে, কোন এলাকায় নতুন রেললাইন বা স্টেশন প্রয়োজন এবং কোন রুটে নতুন ট্রেন চালালে সবচেয়ে বেশি মানুষ উপকৃত হবেন—এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।

একই সঙ্গে যেসব জেলায় এখনো পর্যাপ্ত রেল যোগাযোগ নেই, সেসব জেলার জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শুধু আন্তঃনগর ট্রেন বৃদ্ধি নয়, কমিউটার, লোকাল এবং সাধারণ যাত্রীসেবার উন্নয়নও জরুরি। কারণ রেল যোগাযোগের সুবিধা যদি কেবল বড় শহরের ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী কিংবা উচ্চ ও মধ্যবিত্ত যাত্রীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে গণপরিবহন হিসেবে রেলের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।

বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে তাই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাশিত: যশোরের তিনটি নতুন ট্রেনের দাবির পেছনে যাত্রী ও আয়সংক্রান্ত সমীক্ষার ফলাফল কী? খুলনা বিভাগের অন্য নয়টি জেলার জন্য কী পরিকল্পনা রয়েছে? নতুন কোচ বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোন মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে? পদ্মা সেতু রেলসংযোগের সুফল সব জেলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে কি?

যশোরের মানুষের ট্রেন চাওয়া স্বাভাবিক এবং যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু সেই দাবি যেন বৃহত্তর অঞ্চলের অন্যান্য মানুষের প্রয়োজনকে ছাপিয়ে না যায়। পদ্মা সেতু কোনো এক জেলার সম্পদ নয়; এটি জাতীয় বিনিয়োগ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সম্মিলিত সম্ভাবনার প্রতীক। তাই এর রেল যোগাযোগের সুফলও হতে হবে আঞ্চলিক বৈষম্যহীন এবং জনস্বার্থভিত্তিক।

একটি জেলার আন্দোলন নয়, খুলনা বিভাগের দশ জেলার মানুষের প্রয়োজনকে সামনে রেখেই এর রেল যোগাযোগের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত।

সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

লগইন করুন

সর্বশেষ সংবাদ

অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান

৪৬ মিনিট আগে
অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান

চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় গলায় খাবার আটকে বৃদ্ধের করুণ মৃত্যু

৪৬ মিনিট আগে
চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় গলায় খাবার আটকে বৃদ্ধের করুণ মৃত্যু

পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ, শীর্ষে ঢাকা বোর্ড

১ ঘন্টা আগে
পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ, শীর্ষে ঢাকা বোর্ড

আইসিসিবিতে শুরু 'গ্র্যান্ড মিউজিক্যাল নাইট'

১ ঘন্টা আগে
আইসিসিবিতে শুরু 'গ্র্যান্ড মিউজিক্যাল নাইট'

৩ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবীর মিলনমেলা

২ ঘন্টা আগে
৩ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবীর মিলনমেলা

আইসিসিবির ‘সুপার সেল কার বাজারে’ উপচে পড়া ভিড়, ক্রেতাদের আকর্ষণ করছে নানা অফার

২ ঘন্টা আগে
আইসিসিবির ‘সুপার সেল কার বাজারে’ উপচে পড়া ভিড়, ক্রেতাদের আকর্ষণ করছে নানা অফার

এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীরা এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ পাবেন

৩ ঘন্টা আগে
এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীরা এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ পাবেন

লোকসংগীতের ঐতিহ্য রক্ষায় নতুন অধ্যায়

৩ ঘন্টা আগে
লোকসংগীতের ঐতিহ্য রক্ষায় নতুন অধ্যায়

এমপি গোলাম রসুল

৪ ঘন্টা আগে
এমপি গোলাম রসুল

খুলনা বিভাগে আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন, শুধু কি যশোরের সুবিধা?

৪ ঘন্টা আগে
খুলনা বিভাগে আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন, শুধু কি যশোরের সুবিধা?

নোটিফিকেশন চালু করুন

সর্বশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো সবার আগে পেতে নোটিফিকেশন চালু করে রাখুন।