সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
আবরার ফাহাদ হত্যার ৭ বছর | চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় শোকাহত পরিবার
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের আজ সপ্তম বার্ষিকী। ২০১৯ সালের এই দিনে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় বিচারিক আদালত ২০ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে হাইকোর্টও সেই সাজা বহাল রাখেন। তবে, চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ না হওয়ায় আপিল বিভাগে আসামিদের আবেদনের নিষ্পত্তি হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে মামলাটি।
গত সাত বছর ধরে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির আশায় থাকা আবরার ফাহাদের পরিবার এখন হতাশায় নিমজ্জিত। একের পর এক আদালতের রায় এলেও তাদের প্রতীক্ষার যেন শেষ নেই। রায় কার্যকরের অগ্রগতি নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ জানিয়েছেন, তার ভাইয়ের হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পরিবারকে নয়, দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তিনি দাবি করেন, আবরার হত্যার পর জনগণের মধ্যে যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, তা পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল। ফাইয়াজ বলেন, "ফ্যাসিবাদ বিদায়ের সূত্রপাত হয়েছিল আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। কিন্তু যাদের কারণে আজ পরিবর্তন এসেছে, সেই হত্যার বিচারই এখনো শেষ হয়নি।"
তিনি আরও বলেন, "২০২৫ সালের মার্চে হাইকোর্টের রায়ের পরও আমরা অপেক্ষা করছি। বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করলেও আমাদের বলা হয়, মামলা সিরিয়াল অনুযায়ী এগোয়।" ফাইয়াজের অভিযোগ, "সিরিয়াল এগিয়ে আনা যায়। কিন্তু তারা সিরিয়াল এগিয়ে আনতেও দ্বিধাবোধ করে। আমরা যেখানে যেখানে যোগাযোগ করার দরকার, করেছি। এখন অপেক্ষা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই।" রায় কার্যকরে কোথায় বাধা, তা তাদের পরিবারের অজানা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "এখন মনে হচ্ছে এগুলো অবহেলা ছাড়া আর কিছুই না।"
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুষ্টিয়া জেলা কমিটির সদস্যসচিব সুলতান মাহমুদ তালহা মন্তব্য করেন, আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, যা আজ বিদায় নিয়েছে। তিনি নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, "তাদের উচিত আবরার ফাহাদের হত্যায় জড়িত আসামিদের রায় দ্রুত কার্যকর করা। আর এই দাবি শুধু আমার নয়, দেশের প্রতিটি মানুষের দাবি।"
আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ ক্ষোভের সাথে বলেছেন, সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে আবরার হত্যা মামলাটির গুরুত্বও কমে গেছে বলে তাদের মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, "আবরার ফাহাদের আসামিদের রায় কার্যকর শুধু আমার পরিবারের চাওয়া নয়, এটা সারা বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া। তারপরও রায় কার্যকর হচ্ছে না। এতে শুধু আমি নই, দেশের সবাই হতাশ।" দ্রুত বিচারকার্য সম্পন্ন করার জন্য তিনি সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর ভারত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের পানি বণ্টনসহ বিভিন্ন বিষয়ে করা চুক্তি নিয়ে আবরার ফাহাদ ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। পরদিন ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে তাকে ডেকে নিয়ে অমানবিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর করা হয়। ৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে নির্যাতনের একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয় এবং পরদিন ৭ অক্টোবর হলের সিঁড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
আবরার ফাহাদ বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। তার হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যা বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি, আবাসিক হলে নির্যাতন এবং ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আবরারের বাবা বাদী হয়ে চকবাজার থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর পুলিশ বুয়েটের ২৫ শিক্ষার্থীকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচারিক প্রক্রিয়া চলার পর, ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার একটি আদালত ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন।
এরপর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্টও বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। তবে, এখানেই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে কয়েকজন আসামি আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন। ফলে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষা রয়েছে। আবরারের পরিবারও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কবে তারা এই চূড়ান্ত রায় কার্যকর হতে দেখবে।
এদিকে, আবরার ফাহাদের স্মরণে কুষ্টিয়ার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামে একটি আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। কুষ্টিয়াবাসীও আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
সমাজ উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের অঙ্গীকার
১ দিন আগে
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন চেষ্টার অভিযোগে মাদরাসাশিক্ষক কারাগারে
২ দিন আগে
পূজার পথে নারীদের স্বর্ণালংকার ও মোবাইল লুট
২ দিন আগে