সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য | আড়ালে রয়ে গেল যেসব প্রশ্ন
জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব নাটকীয় ঘটনা ঘটে চলেছে, তা কেবল একটি স্টুডিও ভাঙচুর বা আর্থিক ক্ষতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। একে একে তার বিভিন্ন বক্তব্য, বিএনপির নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে সরে আসা, সর্বশেষ টকশোতে সরকারকে দেওয়া সরাসরি চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে গোটা পরিস্থিতি এক রহস্যময় মোড় নিয়েছে। এই পুরো ঘটনায় হামলার মূল উদ্দেশ্য, অভিযোগের সত্যতা এবং এর পেছনে ভিন্ন কোনো মহলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
সম্প্রতি ঢাকার ইসিবি চত্বর সংলগ্ন সালমানের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিও’তে হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। হামলার পর পরই সালমান মুক্তাদির ফেসবুক লাইভে এসে অভিযোগ করেন, বিএনপির নেতা-কর্মীদের নাম ব্যবহার করে তার কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল এবং চাঁদা না দেওয়ায় তার স্টুডিওতে হামলা চালানো হয়। তবে কিছুদিন পরই তিনি এই বক্তব্য থেকে সরে আসেন। এরপর গত সোমবার রাতে সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দিনের ‘ঠিকানা’ টকশোতে হাজির হয়ে তিনি আবারও কিছু বিস্ফোরক মন্তব্য করেন এবং সরকারকে এক প্রকার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।
টকশোতে সালমানের আক্রমণাত্মক ভঙ্গী এবং বিভিন্ন নথিপত্র থাকার দাবি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি সেখানে দাবি করেন, তার সমস্ত উপার্জন বৈধ এবং এ দেশে না থাকার ঘোষণাও দেন। কিন্তু একই বিষয়ে একেক সময় তার একেক রকম বক্তব্য সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহের দানা বাঁধছে। কেন তিনি প্রথমে বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে পরে অবস্থান বদলালেন, আর এখন কেনই বা এত অনড় অবস্থান নিচ্ছেন—এসব বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক অনুসন্ধান বলছে, হামলার মূল লক্ষ্য হয়তো সালমানের স্টুডিও ছিল না। ইসিবি চত্বরের ওই জমিটি নিয়ে আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘নিউ গিনি প্রপার্টিজ’ এবং এক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে দীর্ঘদিনের মালিকানা ও চলাচলের রাস্তা সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। ওই আবাসন প্রকল্পে হামলার জেরেই পাশে থাকা সালমানের টিনশেড স্টুডিওটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমতাবস্থায় সালমান ওই বিতর্কিত জমিতে স্টুডিও করার আগে মালিকানা যাচাই করেছিলেন কি না, তাও তদন্তের দাবি রাখে।
মামলা দায়েরের प्रक्रिया নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আগে জানিয়েছিলেন যে সালমান থানায় কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেননি। অন্যদিকে সালমানের দাবি, তিনি ঘটনার রাতেই থানায় ভোর পর্যন্ত অবস্থান করে মামলা করার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু পুলিশ প্রথমে তা নেয়নি। মন্ত্রীর বক্তব্যের পরই কেবল মামলাটি গ্রহণ করা হয়। এই দুই পক্ষের বক্তব্যের অমিল দূর করতেও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সালমানের মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোটি মানুষের ওপর সালমানের প্রভাব রয়েছে। তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানসহ অনেকেই তাকে এ বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল বক্তব্য রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ, সত্যতা যাচাই না করে লক্ষ লক্ষ অনুসারীর সামনে কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হলে তা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে, সালমান মুক্তাদিরের আয়ের উৎস নিয়েও তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা শাখা। তার ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের যাবতীয় নথিপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও সালমান দাবি করেছেন তার সব টাকা বৈধ। পাশাপাশি তার শ্বশুর শেখ নূর ইসলামের গুদামে অবৈধ শুল্কমুক্ত মদ রাখার অভিযোগে সিলগালা করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে, যদিও সালমান তার শ্বশুরের সাথে কোনো সুসম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
সব মিলিয়ে, সালমান মুক্তাদিরকে ঘিরে চলমান বিতর্ক এখন শুধু ভাঙচুরের মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, অর্থনৈতিক উৎস এবং জমি সংক্রান্ত জটিলতা একে অপরের সাথে জড়িয়ে গেছে। তাই ঘটনার সত্যতা উদ্ঘাটনে এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাকে বিশদ জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখাই এখন সময়ের দাবি।