সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
দেশে সারের কৃত্রিম সংকট | মাগুরা, ঝিনাইদহ, যশোরাসহ দেশজুড়ে কৃষকের ভোগান্তি
স্টাফ রিপোর্টার: চলমান আমন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে তীব্র বিপাকে পড়েছেন দেশের কৃষকরা। ডিলার বা খুচরা দোকানে সারের সরবরাহ নেই বলে জানানো হচ্ছে, অথবা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে, যা কৃষকদের ক্ষোভের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, অতি মুনাফালোভী আমদানিকারক, সুচতুর ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতাদের একটি অসাধু চক্র মিলে সারের এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
মাগুরার কৃষক প্রহলাদ দাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আগে ডিজেল নিয়ে ঝামেলা পোহাতে হয়েছে, এখন সারের জন্য এই যন্ত্রণা। এত বেশি টাকা দিয়ে সার কিনলে কি আর ফসল পোষাবে?” তার এই প্রশ্ন দেশের অসংখ্য কৃষকের হতাশার প্রতিচ্ছবি। ঝিনাইদহ, যশোর, রাজশাহী এবং নীলফামারীর কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে একই চিত্র পাওয়া গেছে। কোথাও সার পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, আবার কোথাও সার পেতে দীর্ঘ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
অথচ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। বরং গত বছরের একই সময়ের ১২ লক্ষ মেট্রিক টন মজুতের তুলনায় বর্তমানে ১৩ লক্ষ মেট্রিক টনের কাছাকাছি সার সরকারিভাবে মজুত রয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, চলতি বছরে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি এবং অ্যামোনিয়া সারের মোট চাহিদা ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার মেট্রিক টন। এছাড়া, পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং জরুরি সরবরাহের জন্য প্রায় ১৬ লক্ষ মেট্রিক টন সার নিরাপত্তা মজুত হিসেবে রাখা হয়েছে। বর্তমানে সৌদি আরব, মরক্কো, কানাডা এবং রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সার আমদানি চুক্তি রয়েছে এবং তিউনিশিয়া, চীন ও মিশরের সঙ্গেও নতুন চুক্তি প্রক্রিয়াধীন। প্রতি মাসে প্রয়োজনীয় সারের বরাদ্দ সরকারের কাছে তিন থেকে চার মাসের আগাম মজুত হিসেবে রয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
তাহলে প্রশ্ন জাগে, মাঠ পর্যায়ে কৃষকের চাহিদা কেন মিটছে না? কেনইবা কৃষককে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে হচ্ছে বা ডিলারের গুদামে লুটের ঘটনা ঘটছে? স্থানীয় কৃষক, ডিলার, জেলা প্রশাসন এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এই অস্থিরতার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিলার পর্যায়ে সার বিতরণ ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, তা তদারকির দায়িত্ব ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হলেও দেশের একটি ইউনিয়নে সাধারণত মাত্র তিনজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এই দায়িত্ব পালন করেন, যা পর্যাপ্ত নয়। কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, “মজুত আছে কিন্তু বিতরণে সমস্যা, এটা বলে সরকারের পার পাওয়ার সুযোগ নেই। যদি রাস্তা থেকে সার লুট হয়ে যেত, তাহলে না হয় বলা যেত এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু এটা যদি না হয়, তাহলে যাদের মাধ্যমে বিতরণ হয়, তারা তো এমন নয় যে বিরোধী দল। ব্যবস্থাপনার প্রটোকলটাও তো আমাদের জানা।”
পাশাপাশি, গ্যাস সংকটের কারণে দেশের বেশিরভাগ সার কারখানা বন্ধ থাকায় ইউরিয়ার মোট চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ অভ্যন্তরীণভাবে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে, যা সারের সংকট নিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। টিএসপি এবং ডিএপি সারের যে দুটি কারখানা বাংলাদেশে আছে, সেগুলোও কখনোই প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।