সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে কঠোর নিরাপত্তায় ইউরেনিয়ামের নতুন চালান; ডিসেম্বরের মধ্যে আসবে আরও ৯টি
কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইউরেনিয়ামের একটি নতুন চালান প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। রাশিয়া থেকে আকাশপথে ঢাকায় আসার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত পাহারায় সড়কপথে এটি পাবনার ঈশ্বরদীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণস্থলে প্রবেশ করে। শনিবার (৩ অক্টোবর) বেলা ১২টা ২০ মিনিটে জ্বালানিবাহী বিশেষ গাড়িবহরটি নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছায়।
এর আগে শুক্রবার দিবাগত রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে তেজস্ক্রিয় পারমাণবিক জ্বালানিবাহী বিশেষ কার্গো বিমানটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। শনিবার সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে সুদৃঢ় নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে ঢাকা থেকে রূপপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে এই গাড়িবহর। পথে বঙ্গবন্ধু সেতু পাড় হয়ে নাটোরের বনপাড়া ও পাবনার দাশুড়িয়া অতিক্রম করে এটি প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়।
প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট পদস্থ কর্মকর্তারা এই জ্বালানির চালান গ্রহণ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিরতি দিয়ে আকাশপথে চালানটি বাংলাদেশে আনা হয়। প্রাথমিকভাবে বৃহস্পতিবার এটি পৌঁছানোর কথা থাকলেও পরে সময়সূচি পরিবর্তিত হয় এবং শুক্রবার গভীর রাতে বিমানটি ঢাকায় অবতরণ করে।
জ্বালানি পরিবহনের সময় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং যানজট পরিহারের জন্য ঢাকা-পাবনা মহাসড়কে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গাড়িবহরটি অতিক্রমকালে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে সাময়িকভাবে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।
পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ঈশ্বরদী সার্কেল) প্রণব কুমার জানান, ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহরটি নির্বিঘ্নে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছাতে জেলা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট সম্মিলিতভাবে নিরাপত্তা প্রদান করে। যেকোনো ধরনের বিঘ্ন এড়াতে বেলা পৌনে ১২টা থেকে সোয়া ১২টা পর্যন্ত পাবনা-নাটোর-কুষ্টিয়া মহাসড়কে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। বহরটি প্রকল্প এলাকায় প্রবেশের পর মহাসড়কে যান চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা হয়।
ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৯টি কার্গো ফ্লাইটে জ্বালানি আসবে
বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরবরাহ পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে মোট নয়টি কার্গো ফ্লাইটে প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য অতিরিক্ত পারমাণবিক জ্বালানি বাংলাদেশে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ইউনিটের জন্য ৪৮টি এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ১৬৩টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি আসবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাতটি কার্গো দ্বিতীয় ইউনিটের মূল জ্বালানি সরবরাহের জন্য এবং দুটি কার্গো প্রথম ইউনিটের পরবর্তী রিফুয়েলিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রসাটম জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়সূচি অনুসারে ডিসেম্বরের মধ্যেই জ্বালানি সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
কমিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পার করছে রূপপুর
২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে কমিশনিংয়ের বিভিন্ন কারিগরি কার্যক্রম ও পরীক্ষার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়েছে। বিশেষ করে প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি/পিওএসভি)–সংক্রান্ত কারিগরি জটিলতা কমিশনিং কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। সম্প্রতি ১৬ মেগাপ্যাসকেল উচ্চচাপে সংশ্লিষ্ট সেফটি ভালভের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে এনপিসিবিএল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও কয়েকটি বাধ্যতামূলক ও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানির ধারাবাহিক সরবরাহ এবং কারিগরি পরীক্ষার অগ্রগতি বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কমিশনিং কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে জ্বালানি পৌঁছানো বা নির্দিষ্ট কোনো যন্ত্রের পরীক্ষা সফল হওয়া মানেই বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়ে যাওয়া নয়; এর আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই, কমিশনিংয়ের অবশিষ্ট ধাপ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সম্পন্ন করতে হবে।
বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে দেশের বৃহত্তম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি। এর মোট উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক কম-কার্বন বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে এই প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা, যা পরবর্তী সংশোধিত প্রাক্কলনে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
নতুন জ্বালানি চালান পৌঁছানো এবং সেফটি ভালভের সফল পরীক্ষার খবর প্রকল্পটির অগ্রগতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। তবে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় নির্ভর করবে অবশিষ্ট কমিশনিং পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার ওপর।