রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
জন্মজয়ন্তীতে | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশ পদবির খোঁজে
আজ ২৫ শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৬ তম জন্মদিন। তাঁর বংশের পদবি নিয়ে নানা তথ্য পাওয়া যায়। আজকের প্রবন্ধে তাঁর বংশের পদবির বিবর্তন অনুসন্ধান করার প্রয়াস থাকবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমরা ব্রাহ্মণ পরিবারের ঠাকুর বলেই জানি এবং এটাও কম-বেশি জানি তিনি জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সেই জমিদারদের চলার পথ সহজ ছিল না। তাই তারা ভাগ্যের সন্ধানে পূর্ববাংলা হতে কলকাতায় হাজির হয়েছিলেন। আবার তাঁদের পরবর্তী পুরুষেরা ভাগ্যের সন্ধানে পূর্ব বাংলায় ফিরে এসেছিলেন। আর এ উত্থান-পতনের মতোই তাদের পদবিতে দেখা দেয় পরিবর্তন। তাঁরা কখনো পিরালি, কখনো কুশারি আবার কখনো ঠাকুর নামে পরিচিত হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের উপাধি নিয়ে অনেক লোককথা চালু আছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-
পিরালি : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন পিরালি ব্রাহ্মণ। সমাজ পিরালিদের ভালো চোখে দেখত না। পিরালিরা ছিলেন একরকম সমাজচ্যুৎ ব্রাহ্মণ। ঐতিহাসিকগণের মতে যশোর জেলার চেঙ্গুটিয়া পরগনার জমিদারি প্রশাসন পরিচালনা করতেন বর্তমান কালের ঠাকুরদের পূর্বপুরুষেরা। সেই পূর্বপুরুষদের একজন হলেন রঘুনাথ আচার্যের বংশধর জয়কৃষ্ণ। জয়কৃষ্ণের দুই পুত্র। একজনের নাম দক্ষিণানাথ বা দক্ষিণারঞ্জন রায়চৌধরী। এই দক্ষিণানাথের চার পুত্র। কামদেব, জয়দেব, রতিদেব ও শুকদেব। কামদেব ও জয়দেব এক সামান্য রসিকতার কারণে তাদের জীবন থেকে তাদের পূর্বপুরুষের ধর্ম হারিয়ে যায়। তাদের নাম হয়ে যায় যথাক্রমে কামাল খাঁ ও জামাল খাঁ। রসিকতার পর থেকে তাদের পরবর্তী জীবন কাটে ধর্মান্তরিত মুসলিম হিসেবে। কামদেব ও জয়দেব মুসলামন হলেন কিন্তু সমাজ থেকে তার অপর দুই ভাই ও আত্মীয়-স্বজনদেরকে হিন্দু সমাজচ্যুৎ করা হলো । সে সময়ে কামদেব ও জয়দেবের বংশের লোকজনকে অবজ্ঞা করে পিরালি (পির+আলি=পিরালি) বলে সম্বোধন করা হতো। অর্থাৎ হিন্দু সমাজ কামদেবের স্বজনদেরকে মুসলিমদের অনুসারি হিসেবে বিবেচনা করত।
কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে মুসলিম শাসক খান জাহান আলি যখন যশোর জেলার চেঙ্গুটিয়া পরগনার শাসন দায়িত্ব পান সে সময়ে তার সঙ্গী হিসেবে তাহের খাঁ নামক এক ব্যক্তি আসেন। এই তাহের খাঁ ছিলেন ধর্মান্তরিত মুসলিম। তিনি এক সময় অল্প দিনের জন্য নবদ্বীপের পিরাল্যা গ্রামে বসতি গড়েছিলেন। এজন্য তিনি পিরাল্যা খাঁ নামে লোকসমাজে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। কথিত আছে কোন এক রমজান মাসে রোজায় থেকে তাহের খাঁ দিনের বেলায় নেবুর ঘ্রাণ নিচ্ছিলেন। তাই দেখে কামদেব রসিকতা করে বলেছিলেন, ”ঘ্রাণে অর্ধভোজন” এতে তাহের খাঁ অপমানিতবোধ করেন এবং তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ সন্ধান করছিলেন। একদিন তাহের খাঁ নিজ বাড়িতে এক অনুষ্ঠানে সকলকে নিমন্ত্রণ করেন। ওই দিন অনুষ্ঠানে নানা রকম সুগন্ধি মশলা দিয়ে গরুর মাংশ রান্না করা হয়। রান্না করা মাংশের ঘ্রাণ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় কামদেব ও জয়দেব অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তারা গরুর মাংশের ঘ্রাণ থেকে বাঁচার জন্য নাকে-মুখে কাপড় পেঁচিয়ে ছিলেন। তাহের খাঁ তখন তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ঘ্রাণে যদি অর্ধভোজন হয় তাহলে তোমরা গরুর মাংশ দিয়ে অর্ধ পেট ভোজন করেছ। তাহের খাঁর এই বক্তব্য বাহিরে ছড়িয়ে পড়ে । তাহের খাঁ’র বক্তব্য হিন্দুসমাজে বিকৃতভাবে প্রচার হতে থাকে যে, কামদেব এবং জয়দেব গরুর মাংশ ভক্ষণ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। ফলে তখন হিন্দু সমাজ শুধু কামদেব ও জয়দেবকে নয় তাদের অন্য আত্মীয়-স্বজনকেও পতিত হিন্দু বলে আখ্যায়িত করেন এবং তাদেরকে ’পিরালি থাকের ব্রাহ্মণ’ বলে হীনভাবে মূল্যায়ন করেন। সেই থেকেই শুরু হয় পিরালি নামের যাত্রা।
আবার কিছু ঐতিহাসিক আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলের একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। তাঁরা বলেন কামদেব ও জয়দেব দক্ষিণবঙ্গের প্রশাসক পির আলির সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। তখন পির আলি প্রতিশোধ নিতে কামদেব ও জয়দেবকে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করেন। কিন্তু কামদেব ও জয়দেবের অন্য ভাইয়েরা ধর্মান্তরিত হননি। তার পরেও ভাইয়েদের অপরাধে রতিদেব ও শুকদেবকে সমাজচ্যুৎ করা হয়। আর তখন থেকেই তাদের পদবি হয়ে গেলো পিরালি ।
কুশারি : এতক্ষণ আমরা দেখলাম পিরালির ইতিহাস। এবার দেখা যাক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদের নামে কেনো কুশারি পদবি যুক্ত হল। কোন বিবেকবান মানুষ সমাজ ছাড়া থাকতে পারে না। দার্শনিক এরিস্টটল বলেন,’যে সমাজে বাস করে না; সে হয় দেবতা না হয় পশু’। সমাজ মানুষকে ছুড়ে ফেলে দিলেও মানুষ তার নিজ প্রয়োজনে আবার সামাজের কাছে ফিরে আসে। ঠিক এমনটিই ঘটেছিল পিরালি ব্রাহ্মণদের ভাগ্যে। একটা পর্যায়ে এসে জাত ব্রাহ্মণরা পিরালি ব্রাহ্মণদের সাথে কোন প্রকার সম্পর্ক রাখতে বা গড়তে চায়তো না। তাই পিরালিরা অনেক চাতুরি করে তাদের ছেলে-মেয়েদের বিবাহের ব্যবস্থা করতেন। এই চাতুরির একটি অংশ হলো কামদেব ও জয়দেবের ভাই শুকদেবের মেয়ের বিবাহ। শুকদেব ঘোষণা করলেন, তার মেয়েকে যে বিয়ে করবে তাকে প্রচুর অর্থ-সম্পদ দেওয়া হবে। অর্থ সম্পদের লোভে জগন্নাথ কুশারি নামক এক রাঢ়ী গোত্রীয় ব্রাহ্মণ শুকদেবের মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি হল। রবীন্দ্রনাথের জীবনীকার শ্রীপ্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের যে জীবনী লিখেছেন সে বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে কুশারিদের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন,”কুশারিরা হলেন ভট্টনারায়ণের পুত্র দীন কুশারির বংশজাত, দীন মহারাজ ক্ষিতিশুরের নিকট কুশ নামক গ্রাম (বর্ধমান জেলায়) পাইয়া গ্রামীণ হন এবং কুশারি নামে খ্যাত হন। দীন কুশারির অষ্টম কি দশম পুরুষ জগন্নাথ কুশারি।”
হিন্দু সমাজ যেহেতু পিরালিদেরকে সমাজচ্যুৎ করেছিল তাই পিরালি বংশে বিয়ে করার অপরাধে জগন্নাথ কুশারিকেও সমাজচ্যুৎ করা হল। তখন জগন্নাথ কুশারির শশুর শুকদেব, জগন্নাথ কুশারিকে বারোপাড়া নামক গ্রামে অনেক জমি দান করলে জগন্নাথ কুশারি সেখানে বসতি স্থাপন করেন। কোন কোন মতে জগন্নাথ কুশারি ছিলেন খুলনা জেলার পিঠাভোগের জমিদার। তিনি পিরালি ব্রাহ্মণ শুকদেবের মেয়েকে বিয়ের অপরাধে পিঠাভোগ ছাড়তে বাধ্য হন এবং খুলনার দক্ষিণডিহিতে বসবাস করতে শুরু করেন। এই জগন্নাথ কুশারিই ছিলেন ঠাকুর পরিবারের আদিপুরুষ।
জগন্নাথ কুশারির দুই পুত্রের মধ্যে পুরুষোত্তম ছিলেন দ্বিতীয়। তিনি একজন মুসলিম রমনিকে বিয়ে করেন। এ অপরাধে কুশারি পরিবার অনেক দিন পরে আবার নতুন করে সমাজচ্যুৎ হয়। পুরুষোত্তমের পুত্র বলরাম, বলরামের পুত্র হরিহর আর হরিহরের পুত্র রামানন্দ। এই রামানন্দের দুইপুত্র মহেশ্বর ও শুকদেব। জ্ঞাতিদের সাথে দ্বন্দ্ব ও অশান্তি থেকে মুক্তি ও জীবিকার জন্য তারা কলকাতার দক্ষিণ গোবিন্দপুর এসে বাস করতে থাকেন। কলকাতার গঙ্গাতীরের কালিঘাটের গোবিন্দপুর নামক গ্রামে তারা জমি ক্রয় করেন এবং শিবের পুজা করতে শুরু করেন। অর্থাৎ ধর্মীয়ভাবে তারা স্থানীয়দের কাছে সম্মানের পাত্র হয়ে ওঠেন। সেই থেকেই পিরালিদের পরিচয় হয়ে গেলো কুশারি।
ঠাকুর উপাধি : কুশারিরা যখন গোবিন্দপুরে অবস্থান করেন তখন পর্তুগিজ ও ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক জাহাজ ভিড়ত গোবিন্দপুরের গঙ্গা তীরে। সে সময়ে শুকদেবের পুত্র পঞ্চনান কুশারি ইংরেজ ও পর্তুগিজ কাপ্তানদের খাদ্য ও পানি সরবরাহ করতেন। আর একাজে সাহায্যের জন্য তিনি স্থানীয় অনেক শ্রমিককে নিয়োগ করেছিলেন। তারা পঞ্চনন কুশারির আচরণে খুব সন্তোষ্ট ছিলেন। তাই শ্রমিকরা পঞ্চনন কুশারিকে ঠাকুরমশাই বলে সম্বধোন করতেন। এই সম্বোধন শুনে ইংরেজরাও তাকে ঠাকুর বলে সম্বধোন করতেন । সেই থেকেই কুশারি পদবির স্থলে ”ঠাকুর” পদবির সূচনা হলো। আর সে থেকেই পঞ্চনন কুশারির উত্তর-পুরুষরা ঠাকুর পদবিতে পরিচিত হলো।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
ইকবাল আহ্বায়ক ও মুকুল সদস্য সচিব : আলমডাঙ্গায় নজরুলবর্ষ বাস্তবায়ন প্রস্তুতি কমিটি গঠন
২ সপ্তাহ আগে
নিমগ্ন পাঠাগারে ইমদাদুল হকের ছোটগল্পে গ্রামীণ জীবন ও ইসলামি ঐতিহ্যের ব্যবহার শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত
৩ সপ্তাহ আগে
আলমডাঙ্গায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মরণসভা
১ মাস আগে