আলমডাঙ্গায় গাছখোরদের দাপট: সড়ক সম্প্রসারণের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে শতবর্ষী বটবৃক্ষও
সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
আলমডাঙ্গায় গাছখোরদের দাপট: সড়ক সম্প্রসারণের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে শতবর্ষী বটবৃক্ষও
রহমান মুকুল: আলমডাঙ্গা উপজেলায় একের পর এক মূল্যবান ও শতবর্ষী বৃক্ষ নিধনের ঘটনায় পরিবেশ সচেতনমহলে উদ্বেগ বাড়ছে। সড়ক সম্প্রসারণ, জননিরাপত্তা কিংবা ঝুঁকির অজুহাত দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা গাছখোর চক্র নির্বিঘ্নে গাছ কেটে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট গাছগুলো সংরক্ষণ করেই উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল বলে দাবি স্থানীয়দের।
সম্প্রতি আলমডাঙ্গার সনাতনপুর সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি শতবর্ষী বটগাছ কেটে ফেলার ঘটনায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও গাছটি রক্ষার বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গাছটি কেটে ফেলা হয় এবং পরে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।
এর পর একই ধরনের ঘটনা ঘটে অঘোরনাথ মোড়ে। প্রায় অর্ধশত বছরের পুরোনো একটি বিশাল বটগাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঈদুল আজহার আগে গাছটির বড় বড় ডালপালা কেটে ফেলা হলে বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকদের নজরে আসে। তাদের হস্তক্ষেপে সাময়িকভাবে গাছ কাটা বন্ধ হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে গাছ কাটার সরঞ্জাম ও কাটা অংশের কিছু অংশ উদ্ধার করে।
তবে বাধার মুখে পড়েও থেমে থাকেনি সংশ্লিষ্ট চক্র। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গাছ কাটার অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয় এবং গণস্বাক্ষরও সংগ্রহ করা হয়। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি গাছটি সত্যিই এতদিন জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি আগে কেন সামনে আসেনি? তাদের মতে, দুটি ছায়াদানকারী ও পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ অক্ষত রেখেও সড়ক সম্প্রসারণের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল।
এদিকে, সরকারি গাছ নিধনের অভিযোগও নতুন নয়। আলমডাঙ্গার জামজামি এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য রফি মেম্বারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সরকারি গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি হোগলার দাড়ি এলাকায় জিকে ক্যানেলের পাড়ে বন বিভাগের চারটি বড় মূল্যবান মেহগনি গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। পঞ্চম গাছটি কাটার সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাধা দেয় এবং এক শ্রমিককে আটক করে। তবে অভিযোগের তীর যাঁর দিকে, সেই ব্যক্তি ঘটনাস্থল থেকে সরে যান।
পরবর্তীতে কাটা গাছগুলোর পাশে সরকারি জমিতে বসবাসরত এক ব্যক্তির মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করা হয়। আবেদনে দাবি করা হয়, ঝড় হলে গাছগুলো ঘরের ওপর ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই যুক্তির ভিত্তিতেই নামমাত্র মূল্যে পরে গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে বনবিভাগের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, আগে গাছ কেটে ফেলার পর অনুমতি নেওয়ার এই সংস্কৃতি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে?
শুধু চলতি বছরই নয়, গত বছরও হাউসপুর-আটকপাট সড়কের পাশে থাকা কয়েক লাখ টাকা মূল্যের কড়ই গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। সেটিও নামমাত্র মূল্যে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব গাছের প্রকৃত মূল্যায়ন না করে নামমাত্র মূল্যে বিক্রির সুযোগ তৈরি করা হয়, যার সুবিধা নেয় একটি সংঘবদ্ধ গাছখোরচক্র।
পরিবেশবাদী ও সচেতন নাগরিকদের মতে, আলমডাঙ্গায় বৃক্ষ নিধন এখন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি একটি সংগঠিত প্রবণতায় রূপ নিয়েছে। বন বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং জেলা পরিষদের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে গাছখোরদের অর্থনৈতিক যোগসাজশ রয়েছে—এমন অভিযোগও বহুদিনের। যদিও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শতবর্ষী বটগাছ কেবল একটি বৃক্ষ নয়; এটি একটি স্থানীয় ক্ষুদ্র পরিবেশব্যবস্থা। এমন একটি গাছ কেটে ফেলতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগলেও তার বিকল্প তৈরি হতে লেগে যায় কয়েক প্রজন্ম।
প্রশ্ন উঠেছে, উন্নয়নের নামে আলমডাঙ্গা কি ধীরে ধীরে তার সবুজ ঐতিহ্য হারাতে বসেছে? নাকি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে থামানো হবে গাছখোরদের অবাধ দৌরাত্ম্য? স্থানীয় পরিবেশপ্রেমী মানুষের প্রত্যাশা, প্রশাসন কেবল অনুমতি দেওয়ার ভূমিকা নয়, বরং শতবর্ষী বৃক্ষ রক্ষায় কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তবেই হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বেঁচে থাকবে আলমডাঙ্গার সবুজ ছায়া।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
সুনামগঞ্জ থেকে হেলিকপ্টারে করে বিয়ে করতে আসলেন চুয়াডাঙ্গায়
২ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গায় প্রবাসী ব্যবসায়ী মেয়র প্রার্থী হাসিবুল হক লিপুর উদ্যোগে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও ডাস্টবিন স্থাপন
২ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গায় ফুটপাত ও ব্রিজ দখলমুক্ত করতে অভিযান; আনন্দধামের ঝুঁকিপূর্ণ দোকান সরানোর নির্দেশ
১৫ ঘন্টা আগে