সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে খাদ্য সরবরাহে অনিয়ম | পণ্যের দাম বাড়িয়ে কমানো হলো রোগীদের বরাদ্দ
মেহেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের খাদ্য সরবরাহে নানা অনিয়ম ও চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের দৈনিক পথ্য বাজেট অপরিবর্তিত রেখে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের চুক্তিভিত্তিক দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে ধরা হয়েছে। পরবর্তীতে বাড়তি দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার অজুহাতে চাল, ডাল, মাছ, মাংস, সবজি ও ফলের দৈনিক বরাদ্দ সংকুচিত করা হয়েছে। কিছু কিছু পণ্যে বরাদ্দ সর্বোচ্চ ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হলেও বিপরীতে সকালের নাস্তা থেকে চিনি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, ২ কোটি টাকার দরপত্রে কারিগরি ও আর্থিকভাবে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে প্রায় ১৫ লাখ ৭২ হাজার ৮২২ টাকা বেশি দরে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের ফলে রোগীদের পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
হাসপাতালের খাদ্য সরবরাহসংক্রান্ত দরপত্র ও অনুমোদিত মূল্যতালিকা পর্যালোচনায় জানা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভর্তি রোগীদের খাবার সরবরাহে ২ কোটি টাকা আনুমানিক খরচে টেন্ডার আহ্বান করা হয় (টেন্ডার আইডি: ১৩০৮২৫৭, প্যাকেজ নম্বর: Meher/e-Tender/2026-27-GD-9)। এতে তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাব জমা দেয়। সর্বনিম্ন দরদাতা (এল-১) আদিল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল প্রস্তাব করেছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ৪০ হাজার ৫৯২ টাকা, যা ছিল অনুমিত খরচের চেয়ে ৯.৮০ শতাংশ কম। অন্যদিকে, দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ঢাকার ওয়েলনেস ট্রেডিং দর দেয় ১ কোটি ৯৬ লাখ ১৩ হাজার ৪১৩ টাকা ৮৯ পয়সা (১.৯৩ শতাংশ কম)। কিন্তু সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে ১৫ লাখ ৭২ হাজার ৮২২ টাকা বেশি মূল্যে ওয়েলনেস ট্রেডিংয়ের সঙ্গেই ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর চুক্তি স্বাক্ষর করেন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. সাজ্জাত হাসান।
পিপিআর-২০২৫ ও সরকারি ক্রয় আইন অনুযায়ী সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও ঠিক কী কারণে আদিল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে অযোগ্য করা হলো, তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। একই সাথে খাদ্যতালিকায় পথ্য বাবদ ১৭৫ টাকার দৈনিক সরকারি বরাদ্দ একই রাখা হলেও খাদ্য সামগ্রীর দর অতিরিক্ত ধরে বরাদ্দ ব্যাপকভাবে কমানো হয়।
২০২৪-২৫ ও পরবর্তী অর্থ বছরের তালিকা অনুযায়ী, সকালের নাস্তায় প্রতিটি ডিমের দর ১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৩ টাকা করা হয়েছে (বৃদ্ধি ৯১.৬৭%)। কলার দর প্রতি পিস ৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬ টাকা নির্ধারণ করে (বৃদ্ধি ১৬৬.৬৭%) রোগীর বরাদ্দ ২টির জায়গায় ১টিতে নামিয়ে আনা হয়। পাউরুটির কেজি ২৬০ টাকা থেকে ২৭৫ টাকা করে বরাদ্দ ৮০ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৭০ গ্রাম করা হয় এবং নাস্তা থেকে ১০ গ্রাম চিনি সম্পূর্ণ ছেঁটে ফেলা হয়।
দুপুর ও রাতের খাবারের ক্ষেত্রেও মূল খাদ্যসামগ্রীর বরাদ্দ কমানো হয়েছে। চালের দর প্রতি কেজি ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৬ টাকা হলেও রোগীর বরাদ্দ ৪০০ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৩৪০.৩ গ্রাম করা হয়। ডালের দর কেজিপ্রতি ১২০ টাকা থেকে ১৭৮ টাকা ধরা হলেও বরাদ্দ ২৫ গ্রাম থেকে কমিয়ে করা হয় মাত্র ১৪ গ্রাম (৪৪% হ্রাস)। খাসির মাংসের দর কেজিপ্রতি ১,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,১৭০ টাকা করে বরাদ্দ ৭০ গ্রাম থেকে ৬০ গ্রামে নামানো হয়েছে। রুই মাছের দর ৩০০ টাকার স্থলে ৩৪৯.০৭ টাকা ধরে বরাদ্দ ২৩৩.৩৩ গ্রাম থেকে কমিয়ে ২০১ গ্রাম করা হয়। পাঙ্গাস মাছের বরাদ্দ ৩১৮.১৮ গ্রাম থেকে কমিয়ে ২৭৩.৮ গ্রাম এবং সিলভার/গ্রাসকার্পের বরাদ্দ ২৮০ গ্রাম থেকে কমিয়ে ২৪০.৯ গ্রাম নির্ধারণ করা হয়।
সবজি ও অন্যান্য খাদ্য উপাদানে কাটের মাত্রা আরও ভয়াবহ। পটল, লাউ, ফুলকপি ইত্যাদির দর ১০ টাকা থেকে ১১.৩৫ টাকা ধরে দৈনিক বরাদ্দ ৪৫৯ গ্রাম থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ১৭৮.৫ গ্রাম (৬১.১১% হ্রাস)। পেঁপের দর ৩৫ টাকা থেকে ৪৮.৭৮ টাকা নির্ধারণ করে বরাদ্দ ১৩১.১৪ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৪১.২ গ্রামে আনা হয়, যা ৬৮.৫৮ শতাংশ হ্রাস। আলুর দর ৮০ টাকা থেকে ৮২.৭১ টাকা ধরে বরাদ্দ ৫৭.২৫ গ্রাম থেকে কমিয়ে করা হয় ২৫ গ্রাম। সয়াবিন তেলের দর ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৭৫ টাকা নির্ধারণ করে রোগীর বরাদ্দ ১২ গ্রাম থেকে নামানো হয় ১০ গ্রামে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, পুরনো বাজেট দিয়ে মানসম্মত খাবার দেওয়া এমনিতেই চ্যালেঞ্জিং, তার ওপর এমন দর বৃদ্ধি ও পরিমাণ কমানোর ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন দরিদ্র ও সাধারণ রোগীরা। দ্রুতই এ পথ্য বাজেট পুনর্নির্ধারণ ও দরপত্রের অনিয়ম তদন্তের দাবি তুলেছেন তাঁরা।
অতিরিক্ত দরে কাজ পাওয়া ওয়েলনেস ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী ওয়ায়েস খানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট উত্তর না দিয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। সাবেক সুপার ডা. শায়লা শারমিনের সঙ্গে নিকটাত্মীয়তার সূত্রে প্রভাব খাটিয়ে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ বিষয়েও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। অন্যদিকে তৎকালীন হাসপাতাল সুপার ডা. সাজ্জাত হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. নাসিম আখতার জানান, টেন্ডার চুক্তি সম্পাদনের সময় তিনি এখানে দায়িত্বে ছিলেন না এবং নথির কিছু বিষয় দাপ্তরিকভাবে গোপনীয়। তবে কার্যভার গ্রহণের পর পণ্যের অতিরিক্ত দামের বিষয়টি তার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তিনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যেন কোনো অবস্থাতেই রোগীদের খাবারের মান ও পরিমাণে ত্রুটি বা ঘাটতি না ঘটে।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
মেহেরপুর রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে বিএনপি নেতাদের ঝটিকা পরিদর্শন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি
৪ ঘন্টা আগে
মেহেরপুরে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে অংশীজনদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
৬ ঘন্টা আগে
মেহেরপুরে কসমেটিকস ও ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ প্রতিষ্ঠান ‘ওপিএ’-এর শুভ উদ্বোধন
৬ ঘন্টা আগে