শীতবস্ত্র বিতরণ রাতে শীতার্তদের দ্বারে দ্বারে কম্বল হাতে আলমডাঙ্গার ইউএনও
শৈত্যপ্রবাহের দাপুটে রাত। ঘন কুয়াশা বৃষ্টির মত ঝরছে।রাত গভীর হলে আলমডাঙ্গা যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে আসে। চারপাশে ঘন কুয়াশা, হিম ভেজা বাতাসে কাঁপে শরীর। ঘড়ির কাঁটা যখন উপর ছুঁয়ে যায়, তখনও তীব্র শীতের কামড়ে ঘুম আসে না অনেকের চোখে। শীতের কামড়ে কুঁকড়ে থাকে ছিন্নমূল মানুষ, রেললাইনের ধারে ঝুপড়ির বাসিন্দা, বৃদ্ধ, বিধবা আর প্রতিবন্ধীরা।
ঠিক সেই সময়—নিস্তব্ধ রাতের অন্ধকার ভেঙে আলোর মতো হাজির হন একজন মানুষ। হাতে কম্বল, চোখে মমতা আর কাঁধে দায়িত্ব—তিনি আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পান্না আক্তার।
চুয়াডাঙ্গা জেলাসহ আলমডাঙ্গা উপজেলা এখন মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের কবলে। কয়েক দিন ধরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে সহনশীলতার অতিক্রম করে। সূর্যের দেখা মিলছে দেরিতে, দিনভর কুয়াশার চাদর। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। দিনমজুর, ভ্যানচালক, ছিন্নমূল ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের কাছে শীত যেন জীবনের সঙ্গে লড়াই।
সরকারি বরাদ্দের শীতবস্ত্র প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অথচ দরিদ্র মানুষের সংখ্যা অনেক। এই বাস্তবতা সামনে রেখেই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন ইউএনও পান্না আক্তার। দিনের আলোয় আনুষ্ঠানিক বিতরণ নয়—বরং গভীর রাতে, হঠাৎ করেই তিনি হাজির হচ্ছেন শীতার্ত মানুষের দরজায়।
প্রায় প্রতিদিন রাতেই তাঁকে দেখা যাচ্ছে আলমডাঙ্গা রেলস্টেশন এলাকাসহ কোন না কোন হতদরিদ্র এলাকায়। রেললাইনের ঢালের পাশে ঝুপড়ি ঘর, ফুটপাত, হরিজন পল্লি, বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প—কোথাও বাদ নেই। সঙ্গে প্রশাসনের কয়েকজন সদস্য। কিন্তু মূল কাজটি করছেন তিনি নিজেই। নিজ হাতে তুলে দিচ্ছেন কম্বল, খোঁজ নিচ্ছেন অসহায়দের।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তিনি এভাবে রাতের পর রাত ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রচণ্ড শীত, কুয়াশা কিংবা রাতের ভেজা বাতাস—কোনো কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি।
হঠাৎ গভীর রাতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সামনে দেখে অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেননি। কেউ কেউ আবেগে কথা বলতেও ভুলে গেছেন।
আলমডাঙ্গা রেললাইনের পাশের ঝুপড়ির বাসিন্দা বিধবা বৃদ্ধা শৈল বালা রাণী আবেগে কাঁপা গলায় বলেন, “এমন মায়ে অফিসার তো জীবনে দেখি নাই। এত রাইতে, হাড় ফুটা করা শিতি আমার ঘরে আইছেল! আমি অবাক হইয়া গেছি গো। কথা কইতে পারি নাই।”
একই এলাকার বয়স্ক মুদী রাণী বলেন, “ঘুমের ভান কইরা শুয়ে আছিলাম। এত শীত, ঘুম হয় নাকি? হঠাৎ ডাক দেয়। চোখ মেইলি দিকি—মাইয়ে অফিসার। হাতে কম্বল দিইয়া গেছিল। এখন আর রাইতে এত কষ্ট হইবো না।”
শুধু নারী বা বৃদ্ধই নন—প্রতিবন্ধী, অসুস্থ ও ছিন্নমূল মানুষদের মাঝেও এই উদ্যোগ ছুঁয়ে গেছে আশা জাগানিয়া আলো হয়ে।
শীতবস্ত্র পাওয়া শীতার্ত ব্যক্তি লালু বলেন, “বাবারে বাবা, কয়দিন ধরি শিতির বাড়াবাড়ি। গরীব মানুষি কি করে বাঁচে? কাজও নাই, জাড়ও কমেছে না। ভাগ্য ভাল—ইউএনও ম্যাডাম আমাগের বুড়ো মানুষিরে কম্বল দিছে। না হলি কী হইতো, আল্লাই জানে।”
স্থানীয়রা বলছেন, এ উদ্যোগ শুধু কম্বল দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রশাসনের মানবিক উদ্যোগ। সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের কষ্ট বোঝার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার পান্না আক্তার বলেন- “শীতের রাতে সবচেয়ে বেশি কষ্টে থাকে যারা, তারা অনেক সময় আমাদের কাছে আসতে পারে না। তাই আমি তাদের কাছেই যেতে চেয়েছি। সরকারি বরাদ্দ সীমিত হলেও চেষ্টা করছি প্রকৃত দুস্থদের হাতে যেন কম্বল পৌঁছায়। একজন মানুষ যদি এই শীতে একটু স্বস্তি পায়, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
তিনি আরও বলেন,“প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু দাপ্তরিক কাজ নয়। মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের কষ্ট অনুভব করাও আমাদের দায়িত্ব। যতদিন শীত থাকবে, ততদিন এই কার্যক্রম চলবে।”
ইউএনওর এই উদ্যোগে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। অনেকে বলছেন, এমন মানবিক কাজ সমাজে ইতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে এবং অন্যদেরও এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করে।
তীব্র শীতের এই সময় আলমডাঙ্গার অন্ধকার রাতগুলো যেন একটু স্বস্তিকর হয়ে উঠছে। কম্বলের উষ্ণতার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা। গভীর রাতে শীতার্তদের দরজায় দরজায় পৌঁছে যাওয়া এই মানবিক প্রয়াস—প্রশাসনের দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
আলমডাঙ্গায় চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট রাসেলের পক্ষে নির্বাচনী মিছিল
৫ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গায় আমদানি নির্ভরতা কমাতে তেলজাতীয় ফসল আবাদ বাড়ানোর তাগিদ
১৬ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গায় গাঁজা ও ট্যাপেন্টাডলসহ গ্রেফতার ২: ১জন পলাতক
১ দিন আগে