৬৭তম "উদ্ভাস সাহিত্য আড্ডা" ভাবনার আলোয় আলোকিত: বাংলা সাহিত্যের বিশ্বায়ন নিয়ে গভীর আলোচনা
উদ্দীপনা আর সৃজনশীলতার অনন্য আবহে গতকাল হয়ে গেল উদ্ভাস সাহিত্য সংস্থার নিয়মিত আয়োজন "উদ্ভাস সাহিত্য আড্ডা"-এর ৬৭তম অধ্যায়। প্রতিবারের মতোই এবারও এই আড্ডা পরিণত হয়েছিল সাহিত্যপ্রেমীদের এক প্রাণবন্ত, বর্ণিল এবং ভাবনার আলোয় আলোকিত মিলনমেলায়। এই সাহিত্যিক সমাবেশ শুধু আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক আঙিনায় তুলে ধরার এক গভীর প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আড্ডা পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
সভার সভাপতির আসনে ছিলেন বিশিষ্ট ছড়াকার মানোয়ার হোসেন। তিনি তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ কথামালায় আড্ডার সূচনালগ্ন থেকেই এক মননশীল আবহের সৃষ্টি করেন, যা উপস্থিত সকলকে এক অনন্য মানসিক উদ্দীপনা এনে দেয়। পুরো অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন কবি কহন কুদ্দুস, যাঁর সাবলীল বাচনভঙ্গি ও উষ্ণ আবেগ পুরো আড্ডাকে এক সুসংগঠিত স্রোতে বেঁধে রেখেছিল।
আড্ডার প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ইকবাল হোসেন। তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীর আলোচনায় অংশ নেন এবং আজকের প্রেক্ষাপটে সাহিত্য চর্চার গুরুত্ব নতুনভাবে তুলে ধরেন। তাঁর কথায় উঠে আসে, সাহিত্য কেবল মনের খোরাক নয়, এটি সমাজের দর্পণ এবং পরিবর্তনের হাতিয়ার।
বিশেষ অতিথি হিসেবে এই আড্ডাকে সমৃদ্ধ করেছেন কথাসাহিত্যিক পিন্টু রহমান, কথাসাহিত্যিক মোস্তাফিজ ফরায়েজী, কবি ও প্রকাশক আতিকুর ফরায়েজী। আড্ডার বিশেষ আকর্ষণ ছিল দূর প্রবাস থেকে অনলাইন মাধ্যমে যুক্ত হওয়া মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জন ডেলজার, যিনি আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন। এছাড়াও সাহিত্যপ্রেমী সাইদুল ইসলাম এবং আব্দুল হামিদ-সহ আরও বহু গুণীজন ও উৎসাহী পাঠক উপস্থিত ছিলেন, যাঁদের আলোচনা এবং জিজ্ঞাসা আড্ডাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
এই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ ও খোলামেলা আলোচনা হয়। উপস্থিত প্রত্যেকে তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে মতামত প্রকাশ করেন। বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারীর আলোচনায় উঠে আসে সাহিত্যের ভাষান্তর (অনুবাদ), বিশ্বমানের প্রচারণা (প্রমোশন) এবং বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপের ঘাটতি। এই আলোচনার মাধ্যমে উঠে আসা চিন্তাধারা অংশগ্রহণকারীদের গভীর চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে এবং ভবিষ্যতে করণীয় সম্পর্কে নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
শুধুমাত্র আলোচনাতেই নয়, এই আড্ডায় কবিতা, গল্প, ছড়া ও সাংস্কৃতিক নানা দিক নিয়েও মনোজ্ঞ পরিবেশনা ছিল, যা অংশগ্রহণকারীদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। নতুন লেখক ও পাঠকরা যেমন অভিজ্ঞদের সান্নিধ্যে এসে অনুপ্রেরণা লাভ করেন, তেমনি প্রবীণরা ফিরে পান সৃজনশীলতার নবীন আলো। তরুণ লেখকদের স্বরচিত পাঠ উৎসাহিত করেছে নতুনদের আরও বেশি করে সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করতে।
উদ্ভাস সাহিত্য সংস্থা বিশ্বাস করে— সাহিত্যই পারে মানবমনের আবেগ, অনুভূতি ও সৃজনশীলতাকে বিকশিত করতে। তাই এই আড্ডা শুধুই সাহিত্যিক সমাবেশ নয়, এটি ভাবের গভীর বিনিময়, জ্ঞানের নিরন্তর অন্বেষা এবং মানবিকতার এক শক্তিশালী সেতুবন্ধন। আগামী দিনে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে এই ধরনের মননশীল আড্ডাগুলির ভূমিকা অনস্বীকার্য।