চুয়াডাঙ্গাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানী
স্বাধীনতার ৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মহাকুমা শহর চুয়াডাঙ্গার ঐতিহাসিক ভূমিকা—আজও বহু নাগরিকের কাছে অজানা। ১৯৭১ সালের প্রতিরোধ পর্বে এই ছোট্ট শহরটি একটি ঐতিহাসিক পর্বের সাক্ষী হয়েছিল।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যমতে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গাকে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এমনকি, দেশের প্রথম রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম ও সিলমোহর এখান থেকেই তৈরি হয়েছিল।
অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা এবং প্রমাণের উৎসসমূহ
অস্থায়ী সরকার গঠনের পর চুয়াডাঙ্গাকেই সদর দপ্তর করার প্রাথমিক সিদ্ধান্তটি নানা তথ্যসূত্রে নিশ্চিত করা হয়:
- মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি তাঁর ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রতিরোধের প্রথম প্রহর’ গ্রন্থে বলেছেন, ১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠনের পর আকাশবাণীর খবরে চুয়াডাঙ্গাকে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী করা হয় বলে জানা যায়।
- মেজর (পরবর্তীতে লে. কর্নেল) আবু ওসমান চৌধুরী তাঁর ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বইয়ের ২৩৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করে চুয়াডাঙ্গাকে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়।
- ইতিহাস গবেষক সুকুমার বিশ্বাস তাঁর ‘মুক্তিযুদ্ধে রাইফেলস ও অন্যান্য বাহিনী’ বইয়ের ১৭১ পৃষ্ঠায় একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ১০ এপ্রিল আকাশবাণীর খবরে এই ঘোষণা প্রচারিত হয়।
- ফজলুল বারী লিখিত ‘একাত্তরের আগরতলা’ বইয়ে উল্লেখ আছে যে, আগরতলার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল কুষ্টিয়া জেলার চুয়াডাঙ্গাই হবে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সদর দপ্তর।
- রাজীব আহমেদ তাঁর ‘মুক্তিযুদ্ধে চুয়াডাঙ্গা ভূগোল ইতিহাস’ বইয়ের ৫৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ১০ এপ্রিল ’৭১-এ আগরতলায় ২৮ জন এম.এন.এ-র উপস্থিতিতে অস্থায়ী সরকার গঠনের পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গাকে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
- ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল নয়াদিল্লি থেকে UPI পরিবেশিত খবরে বলা হয়, 'The Proclamation, broadcast by the rebel Free Bengal Radio and monitored here said the capital of the Bangla desh (Bengali Nation) government would be Chuadanga, a small town 10 miles from the border with India'.
- ডা. আসহাবুল হক (দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনের প্রধান উপদেষ্টা) ১৯৯৪ সালের ১৭ এপ্রিল 'দৈনিক সংবাদ' পত্রিকায় প্রতিবেদককে জানান, ২ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদ টেলিফোনে তাঁকে চুয়াডাঙ্গায় শপথ গ্রহণ এবং রাজধানী ঘোষণার কথা জানিয়েছিলেন।
- **'সাপ্তাহিক বিচিত্রা'**র বাংলা ১৩৮৩ সালের ৩ বৈশাখ সংখ্যায় প্রতিবেদক শ.ম.শওকত আলী লিখেছেন, চুয়াডাঙ্গায় অস্থায়ী রাজধানী করে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়।
শপথ অনুষ্ঠানের স্থান পরিবর্তন এবং তার কারণ
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিমান হামলা এবং গোপনীয়তা বজায় রাখতে না পারার কারণেই চুয়াডাঙ্গায় মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়নি।
- ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র’-এর ১৫শ খণ্ডে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে বলেন, ১৪ এপ্রিল মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক শপথের দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রথমে চুয়াডাঙ্গাকেই স্থান হিসেবে ভাবা হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত গোপন না থাকায় পাকহানাদার বাহিনী সেখানে বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে। ফলে চুয়াডাঙ্গার কথা বাদ দিয়ে নতুন স্থানের চিন্তা করতে হয়।
- ড. মুনতাসীর মামুনের ‘সেই সব দিন’ বইয়ের ৪৭ ও ৪৮ পাতায় বলা হয়, ১৪ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও, সম্ভবত খবরটি পাকিস্তানিদের কাছে পৌঁছানোয় সেখানে সাংঘাতিক বোমা বর্ষণ করা হয়। এরপর মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
- ১৯৯১ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ার, কুষ্টিয়া-এর ৫১ পৃষ্ঠায় স্বাধীনতা সংগ্রামে চুয়াডাঙ্গার ভূমিকা সম্পর্কে বলা হয়, চুয়াডাঙ্গা স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী বলে ঘোষিত হওয়ার পরই হানাদার বাহিনীর বিমান হামলা শুরু হয়।
- ১৯৯৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর 'ভোরের কাগজ'-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, চুয়াডাঙ্গায় মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করার চিন্তা ছিল, কিন্তু গোপনীয়তার অভাবে পরিকল্পনা পণ্ড হয়ে যায়।
বিভিন্ন সময়ে বিটিভি-ও এই তথ্যটি নিশ্চিত করেছে। ১৯৯৭ সালের ১৭ এপ্রিল 'মুজিবনগর সরকার' অনুষ্ঠানে এবং ১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল 'ঘটনার আড়ালে' অনুষ্ঠানের 'মুজিবনগর' পর্বে চুয়াডাঙ্গাকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- মুক্তিযুদ্ধকালিন ৮ নং সেক্টর কমাণ্ডার মেজর আবু ওসমান চৌধুরী তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, আকাশবাণী থেকে ঘোষণার পরপরই পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জঙ্গী বিমানগুলো চুয়াডাঙ্গার ওপর ব্যাপকভাবে হামলা চালাতে থাকে।
- ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ বাংলাদেশ রেডক্রস এখানে জন্মলাভ করে।
- চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিক পত্রিকা 'প্রথম রাজধানী' নামকরণের ছাড়পত্র পাওয়ায় কর্তৃপক্ষ পরোক্ষভাবে চুয়াডাঙ্গার ঐতিহাসিক মর্যাদার প্রমাণ দিয়েছে।
সংরক্ষণের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা
যদিও মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা (মুজিবনগর) বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অস্থায়ী রাজধানী এবং সেখানে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়—এই সত্যটি অনস্বীকার্য, তবুও মুক্তিযুদ্ধের স্বল্পকালীন গৌরবের স্মৃতি বহনকারী চুয়াডাঙ্গার এই ঐতিহ্য পুরো জাতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের এই গুরুত্বপূর্ণ পর্বটি যেন বিস্মৃত না হয়, সেজন্য রাষ্ট্রকে উপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
আলমডাঙ্গায় চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট রাসেলের পক্ষে নির্বাচনী মিছিল
৬ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গায় আমদানি নির্ভরতা কমাতে তেলজাতীয় ফসল আবাদ বাড়ানোর তাগিদ
১৭ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গায় গাঁজা ও ট্যাপেন্টাডলসহ গ্রেফতার ২: ১জন পলাতক
১ দিন আগে