এআই-এর অন্ধকার দিক: যৌন জিম্মিকরণ ও সাইবার অপরাধ বৃদ্ধি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি বর্তমানে মানব সমাজের প্রতিটি স্তরে, বিশেষ করে দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব গতিতে প্রবেশ করছে। বিশেষজ্ঞরা একমত যে, এই প্রযুক্তি যেমন একদিকে অসংখ্য নতুন সুযোগ এবং উদ্ভাবনের দ্বার উন্মোচন করছে, তেমনি অন্যদিকে এর অনিচ্ছাকৃত ও ইচ্ছাকৃত অপব্যবহার নিয়ে সমাজে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হচ্ছে। সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এআই টুলের ব্যাপক এবং নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের ফলে মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর চরম ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। এর ফলে সমাজে সাইবার অপরাধের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে চলেছে। এআই-এর মাধ্যমে সহজে তৈরি করা যাচ্ছে ঘৃণা ছড়ানো বা বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য (Hate Speech), সংগঠিত হচ্ছে সাইবার বুলিং, এবং সংঘটিত হচ্ছে যৌন জিম্মিকরণ (Sextortion)-এর মতো গুরুতর এবং ভয়াবহ অপরাধ।
এই প্রযুক্তিগত অপরাধগুলোর শিকার হচ্ছেন প্রধানত সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ—নারী ও শিশুরা। সাইবার বুলিং রিসার্চ সেন্টার ২০২৫ সালের জন্য প্রস্তুত করা একটি অনলাইন জরিপের তথ্য প্রকাশ করেছে, যা এই উদ্বেগজনক প্রবণতাকে স্পষ্ট করে তোলে। এই জরিপে দেখা যায়, এআই টুলস ব্যবহার করে খুব কম সময়ে এবং নামমাত্র খরচে ডিপফেক (Deepfake) ছবি এবং ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের, ব্যক্তিগত ছবি এবং ভিডিও ক্লিপ থেকে সংগৃহীত উপাদান ব্যবহার করে তৈরি করা এই ডিপফেক কনটেন্টগুলো তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষে অসম্মানিত করছে, যা ভুক্তভোগীদের জন্য মানহানি এবং আত্মমর্যাদা হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই ধরনের জঘন্য অপব্যবহারের শিকার হওয়া ব্যক্তিরা দীর্ঘমেয়াদী মানসিক আঘাত, তীব্র হতাশা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, এবং অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রবণতাসহ নানা ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সংকটে ভুগছেন।
এআই প্রযুক্তি দ্বারা সংঘটিত এই অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা বিশ্বব্যাপী একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো—এআই-এর ব্যবহার, বিশেষ করে এর অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ে যথেষ্ট কার্যকর আইনি কাঠামো এবং নীতিমালার অভাব। যেহেতু প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত আইনের চেয়ে দ্রুত গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই প্রচলিত আইনগুলো এই নতুন ধরনের সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় ব্যর্থ হচ্ছে। এই আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সহজে নিজেদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারছে এবং প্রায়শই বিচারের হাত থেকে পার পেয়ে যাচ্ছে, যা সমাজে ন্যায়বিচারের ধারণাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং এআই-এর ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, সর্বপ্রথম কাজ হলো এআই-জনিত অপরাধের সংজ্ঞা, তদন্ত প্রক্রিয়া, এবং শাস্তির বিধানসহ একটি সুসংগঠিত এবং শক্তিশালী আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। এর পাশাপাশি, শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং এআই-এর অপব্যবহারের ঝুঁকি এবং পরিণতি সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যন্ত সর্বত্র প্রযুক্তি ব্যবহারের নীতিমালা, নৈতিকতা এবং দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে শিক্ষাদান করা অত্যন্ত জরুরি। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা, যা আইনি কঠোরতা এবং সামাজিক সচেতনতার মিশ্রণে গঠিত, একমাত্র সেই পথ যা এআই-এর অন্ধকার দিক থেকে সমাজকে রক্ষা করতে পারে এবং এর উদ্ভাবনী শক্তিকে মানবতার কল্যাণে কাজে লাগানোর সুযোগ দিতে পারে।
সূত্র: ঢাকা পোস্ট কপিরাইট: রাহাত মিনহাজ