আলমডাঙ্গায় কিছুতেই থামছে না সার পাচার।। কৃষকের ন্যায্য পাওনা লুটছে সিন্ডিকেট
আলমডাঙ্গা উপজেলার যেন নিত্যকার দৃশ্য—সারের বস্তা চলে গোপনে, কৃষকের চোখে জমে আফসোস আর ক্ষোভের রাঙ্গা ধুলো। সরকারি ভর্তুকির সার এখন কৃষকের আবাদী জমির মাটির নিচে নয়, সিন্ডিকেটের গুদামে বন্দি। কৃষি অধিদপ্তরের নিস্পৃহতা ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের নীরব আশ্রয়ে দিনে দিনে বেড়ে উঠছে এই ভয়ঙ্কর বাটপারির সাম্রাজ্য।
গত বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে হাটবোয়ালিয়া-ভালাইপুর সড়কের মহেশপুর মোড় থেকে ৩০ বস্তা রাসায়নিক সার আটক করেছে আলমডাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিস। সাংবাদিক ও স্থানীয় কৃষকদের সহায়তায় সারগুলো আটক করা হয়।
উপসহকারী কৃষি অফিসার খাদেমুল বাসার জানান, একটি নষ্ট আলম সাধু সেখানে ফেলে রাখা ছিল—এমন সংবাদের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে ৩০ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়।
আলম সাধুর চালক জানান, কুমারী ইউনিয়নের গোপীবল্লভপুরের জিনারুল ইসলাম ভাংবাড়িয়া গ্রামের আলোচিত ব্যবসায়ী মিনারুলের দোকান থেকে সারগুলো কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সারের কোনো রশিদ বা সরকারি কাগজপত্র দেখাতে পারেননি তিনি। পরে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার নির্দেশে সারগুলো জব্দ করা হয়।
এর আগে গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের সহায়তায় হাটবোয়ালিয়া বাজার থেকে একই ব্যবসায়ীর দোকান থেকে কেনা আরও ১২ বস্তা সার আটক করা হয়েছিল।
এর পরের সপ্তাহেই ( ২৮ অক্টোবর) আবারও ধরা পড়ে আরেক চালান। জেহালা ইউনিয়নের পিটিআই মোড়ে ৪০ বস্তা ইউরিয়া আটক হয়।
আলমসাধুর চালক সাইফুল বলেন, “ভাংবাড়িয়ার তরিকুল ভাই বাজার থেকে সার তুলে দেয়, ভালাইপুরে বিক্রির কথা ছিল।”
একই গল্প, একই চক্র, শুধু গাড়ি আর তারিখ বদলায়। কৃষকের ফসল বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে, ভর্তুকি অদৃশ্য হচ্ছে সিন্ডিকেটের কাল হাতের ঈশারায়।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, “ ভাংবাড়িয়ার সাফি মিয়ার ডিলার পয়েন্টে সরকারি দামের সার পাওয়া এখন কপালের ব্যাপার। বেশি টাকা দিলে তবেই মেলে।”
এই ‘বেশি টাকা’ই আজ নতুন এক অদ্ভুত ফসল—যা গজায় দালালের পকেটে।
যে সার দিয়ে সবুজ ফসল ফলার কথা ছিল, সেই সার এখন পাচার হয় রাত্রির আঁধারে, সরকারি কাগজপত্রের আড়ালে।
মাঠের কৃষকরা বলেন, “আমরা জমিতে হাল দিই, ঘাম ঝরাই; কিন্তু সার পায় অন্য কেউ। আমার ভাগ্যে সরকার দেয় ভর্তুকি, খায় চোরচক্র।”
তাদের কথায় ফুটে ওঠে এক ভয়ংকর বাস্তবতা—ভাংবাড়িয়ার মাটিতে এখন কৃষকের কান্না অভিশাপপ হয়ে ঝরে।
কেন থামছে না এই চোরাচালান: ভাংবাড়িয়ায় বছরের পর বছর একই কর্মকর্তা একই ইউনিয়নে দায়িত্বে আছেন। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, তিনি নাকি ডিলারদের সঙ্গে “অতি ঘনিষ্ঠ”। সেই সম্পর্কই এখন হয়ে উঠেছে অনিয়মের সিঁড়ি। এমন দৃঢ় ধারণা অনেক কৃষকের।
কৃষি বিভাগের একাংশের চোখ বন্ধ, প্রশাসনের হাতে কেবল ধরা পড়ে পেছনের সারের বস্তা, মূল হোতারা রয়ে যায় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের অপছায়ার আড়ালে।
সচেতনমহলের ধারণা -- সার পাচার বন্ধে সবচে' বড় বাঁধা অনিচ্ছুক প্রশাসন। কৃষকদের দাবি— ডিলারশিপ পুনর্বিন্যাস, কঠোর তদারকি, আর বদলি করতে হবে সেই কর্মকর্তাদের, যারা বছরের পর বছর একই এলাকায় বসে ডিলারদের ‘অতি ঘনিষ্ঠজন’ হয়ে উঠেছেন।
প্রতিটি ইউনিয়নে সরাসরি কৃষক পর্যায়ে সার বিক্রির ব্যবস্থা না হলে এই সিন্ডিকেট ভাঙবে না। তাছাড়া, পৌর এলাকার অপ্রয়োজনীয় ডিলারশীপ কমিয়ে গ্রামাঞ্চলে স্থানান্তরিত করতে হবে।
আলমডাঙ্গার ভাংবাড়িয়া -হাটবোয়ালিয়া সীমান্ত এলাকা এখন শুধু একটা সাধারণ এলাকার নাম নয়, সার পাচারের এক উর্বর জায়গা— যেখানে সরকারি সার মানে দুর্নীতির গন্ধ, কৃষকের ন্যায্যতা মানে অপমানের কালি।
যদি এখনই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তবে অচিরেই ওই অঞ্চলের মাটিতে জন্মাবে অবিশ্বাসের ক্ষোভের সর্বনাশা ফসল।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
আলমডাঙ্গায় চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট রাসেলের পক্ষে নির্বাচনী মিছিল
৮ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গায় আমদানি নির্ভরতা কমাতে তেলজাতীয় ফসল আবাদ বাড়ানোর তাগিদ
১৯ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গায় গাঁজা ও ট্যাপেন্টাডলসহ গ্রেফতার ২: ১জন পলাতক
১ দিন আগে