সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
সরকারি অনুমতি ছাড়াই রিফাইনারি নির্মাণ, অপরিশোধিত তেল আমদানির আবেদনে নতুন বিতর্ক
প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও অপরিশোধিত তেল পরিশোধনাগার (রিফাইনারি) নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান 'সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি'। এবার প্রতিষ্ঠানটি তাদের নির্মাণাধীন প্ল্যান্ট পরিচালনার উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে আবেদন করেছে। তাদের প্রস্তাবে ২০২৭ সালকে লক্ষ্য করে ৪ লাখ টন লাইট ক্রুড এবং ৮ লাখ টন হেভি ক্রুড আমদানির ছাড়পত্র চাওয়া হয়েছে। তবে মূল প্ল্যান্টের কোনো সরকারি অনুমোদন না থাকায় জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক প্রশাসনিক ও সরকারি তদারকি ছাড়া বেসরকারি উদ্যোগে রিফাইনারি স্থাপন ও পরিচালনা দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নীতিমালার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র জ্বালানি শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপিসি যখন উদ্যোগ গ্রহণ করছে, তখন অনুমতিহীন এ বেসরকারি প্ল্যান্টের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও তা বন্ধে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৭ অক্টোবর বিপিসির চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠিতে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার ২০২৭ সালের জন্য উল্লেখিত পরিমাণ লাইট ও হেভি ক্রুড আমদানির অনুমতি চান। তবে এর আগে গত ১৪ জুলাই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীকে দেওয়া অপর এক চিঠিতে কোম্পানিটি তাদের নির্মাণাধীন প্ল্যান্টে লাইট ক্রুড পরিশোধনের পরিকল্পনার বিষয়টি জানিয়েছিল।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বিপিসির ১০ আগস্টের একটি দাপ্তরিক চিঠির ভিত্তিতে ২০২৭ সালে তারা বিপিসিকে মোট ১২ লাখ ৩ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০ টন অকটেন, ১ লাখ ১৯ হাজার টন পেট্রোল, ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টন ডিজেল এবং ৩ লাখ ৬১ হাজার টন হাই সালফার ফার্নেস অয়েল (এইচএফও)। এ পরিমাণ পণ্য উৎপাদনে ৪ লাখ টন লাইট ক্রুড (কনডেনসেট) ও ৮ লাখ টন হেভি ক্রুড প্রয়োজন হবে বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
তবে জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট ও সাবেক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কনডেনসেট ও লাইট ক্রুড মোটেও এক পণ্য নয়। কনডেনসেট মূলত গ্যাসক্ষেত্র থেকে আহরিত গ্যাসের উপজাত এবং লাইট ক্রুড আসে সরাসরি তেলক্ষেত্র থেকে। ফলে দুটি কাঁচামালের রাসায়নিক উপাদান ও উৎস সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক এক মহাব্যবস্থাপক এবং বিইআরসির সাবেক সদস্য মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী উভয়েই বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, কনডেনসেট ও লাইট ক্রুডকে একক পণ্য হিসেবে বিবেচনা করার কোনো বৈজ্ঞানিক বা বাণিজ্যিক ভিত্তি নেই।
ইতোপূর্বে গত ১৪ জুলাই জ্বালানি মন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল জানায়, তারা দৈনিক ৩৫ হাজার ব্যারেল পরিশোধনক্ষমতার রিফাইনারি নির্মাণে সরকারের সহযোগিতা চায়, যার বার্ষিক পরিশোধন ক্ষমতা সাড়ে ১৭ লাখ মেট্রিক টন। তবে ওই আবেদনেও সরকারি অনুমোদন না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। পরবর্তীতে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন এবং সুপার পেট্রোকেমিক্যালের সিইও প্রণব কুমার সাহার চিঠি আদান-প্রদানে ২০২৭ সালের মার্চে ডিস্টিলেশন ইউনিট চালুর পরিকল্পনার কথা নিশ্চিত করা হয়।
বিষয়টি নিয়ে জানতে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি। বিপিসির চেয়ারম্যান ড. রফিকুল ইসলাম জানান, আমদানির অনুমতি চেয়ে পাঠানো চিঠিটি বিপিসির কারিগরি দল পর্যালোচনা করছে। তবে অনুমোদনহীন রিফাইনারি কীভাবে গড়ে উঠছে, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম জানান, অনুমোদন ছাড়া রিফাইনারি স্থাপন আইন পরিপন্থী এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যা দ্রুত আইনের আওতায় আনা উচিত।