অবহেলা আর ঔদাসীন্যে হারিয়ে যাচ্ছে আলমডাঙ্গার গর্বের স্থাপনাগুলি
সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
অবহেলা আর ঔদাসীন্যে হারিয়ে যাচ্ছে আলমডাঙ্গার গর্বের স্থাপনাগুলি
রহমান মুকুল: কুমার নদের জল বয়ে যায়। ঋতু বদলায়। নদীর পাড় বদলায়। বদলায় শহরও। শুধু আলমডাঙ্গার কুমার নদের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা সবেদ আলীর ঘাট নামে পরিচিত পাকা ঘাটটি যেন দাঁড়িয়ে আছে একই জায়গায়—একটি পুরোনো সময়ের সাক্ষী হয়ে। তবে তার শরীরে আর আগের মতো জৌলুস নেই। মোজাইকের কারুকাজে সময়ের বিবর্ণতা, স্থাপনার গায়ে ক্ষয়ের ছাপ। প্রথম সিঁড়িটি ভেঙে উল্টে যাওয়ার উপক্রম। যেন একটু একটু করে ভেঙে পড়ছে শুধু একটি ঘাট নয়—একটি শহরের রুচি, স্মৃতি ও কৃতজ্ঞতারও একেকটি পলেস্তরা।
নব্বই দশকে আলমডাঙ্গা পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এম সবেদ আলী। জনপ্রিয়তা ও সৃজনশীলতার জন্য পরিচিত এই চেয়ারম্যান ছিলেন পৌর উন্নয়নের অন্যতম রূপকার। তাঁর সময়ের অন্যতম কীর্তি কুমার নদে নির্মিত এই দৃষ্টিনন্দন ঘাট।
ঘাটটি দেখলে বোঝা যায়, তখনকার পৌর নেতৃত্ব শুধু প্রয়োজন মেটানোর কথা ভাবেনি, সৌন্দর্যের কথাও ভেবেছিল। মোজাইক করা বড়সড় স্থাপনাটির কোনো অংশ যাতে সহজে বসে না যায় কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য রাখা হয়েছিল ভারসাম্য রক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা। নির্মাণে ছিল স্থাপত্যশৈলীর মুন্সিয়ানা।
কিন্তু নির্মাণের পর আজ পর্যন্ত একবারও সংস্কারের হাত পড়েনি সেখানে।
এম সবেদ আলীর পর আলমডাঙ্গা পৌরসভার চেয়ারম্যান-মেয়রের আসনে বসেছেন অনেকেই। সময়ের সঙ্গে পৌরসভার অনেক কিছু বদলেছে। নতুন নতুন স্থাপনা হয়েছে। উন্নয়নের নানা গল্প লেখা হয়েছে। কিন্তু এই অনন্য ঘাটটির ভাগ্যে জোটেনি সামান্য সংস্কারও। ফলে একসময়কার দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাটি এখন জৌলুস হারিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অবহেলার স্মারক হয়ে।
কুমার নদের স্রোত একই ভাবে বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মানুষের দায়িত্বটুকু যেন কেউ নিতে চাইছে না।
শহরের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদমিনারের গল্পও খুব আলাদা নয়।
প্রয়াত বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও আলমডাঙ্গা পৌরসভার পরপর দুবারের মেয়র মীর মহি উদ্দীন ছিলেন পৌর উন্নয়নের আরেক রূপকার। স্থানীয় বিএনপির এই প্রভাবশালী ও উচ্চশিক্ষিত নেতা তাঁর সময়কালে আলমডাঙ্গা পৌরসভাকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ এবং পানি সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও রেখেছেন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। ( যদিও পানি সাপ্লাই কাজ শেষ করে যেতে পারেন নি)
তাঁর সময়েই পুরোনো শহীদমিনারের স্থলে নির্মিত হয় নতুন ও বৃহৎ আলমডাঙ্গা শহীদমিনার। টাইলস নিকানো ও স্টিলের সীমানা প্রাচীর দিয়ে স্থাপনাটিকে দেওয়া হয়েছিল নান্দনিক রূপ।
কিন্তু গত ১৭ বছরে সেই শহীদমিনারও সংস্কারের মুখ দেখেনি।
বরং এখন স্থাপনাটির স্টিলের অংশ খুলে খুলে নিয়ে যাচ্ছে নেশাগ্রস্তরা—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। যে জায়গায় মানুষের শ্রদ্ধায় মাথা নত হওয়ার কথা, সেখানে সরকারি সম্পদ রক্ষার যেন কেউ নেই। নাগরিকদের আক্ষেপ তাই অকারণ নয়—"সরকারি মাল, দরিয়া মে ঢাল!"
পৌরবাসীর আবেগের শহীদমিনার যখন এভাবে প্রতিনিয়ত ক্ষয়ে যায়, তখন শুধু একটি স্থাপনার সৌন্দর্য নষ্ট হয় না। ক্ষয়ে যায় নাগরিক স্মৃতিও, বোধ দায়িত্ব ।
মীর মহি উদ্দীন নির্মিত আরেকটি গর্বের স্থাপনা স্বাধীনতা স্তম্ভ। আলমডাঙ্গা শহরের বুকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থাপনায় খোদাই করা আছে মহান মুক্তিযুদ্ধে আলমডাঙ্গার যেসব সূর্যসন্তান জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের নাম।
প্রতিটি নাম একটি জীবন। প্রতিটি নাম একটি পরিবারের কান্না। প্রতিটি নাম স্বাধীনতার জন্য দেওয়া একেকটি চূড়ান্ত ত্যাগের দলিল।
কিন্তু নির্মাণের পর সেই স্বাধীনতা স্তম্ভেও সংস্কারের হাত পড়েনি আজোতক।
রোদ-বৃষ্টি আর সময়ের আঘাতে পাণ্ডুর হয়ে যাওয়া স্তম্ভটি এখন যেন নীরবে প্রশ্ন করে—যে শহীদদেরা নিজের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে দেশের জন্য স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের অধিকার ছিনিয়ে এনেছিলেন, অকৃতজ্ঞের মত শহরবাসী কি তাদের অবদান ভুলে গেছে?
এরপর আসে আলমডাঙ্গা বধ্যভূমি। এখানে ঘুমিয়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।এখানে এসে ইতিহাস আর স্থাপত্যের গল্প থাকে না; ইতিহাস মাটির সঙ্গে মিশে একাকার।
মুক্তিযুদ্ধের সময় লালব্রিজের দুপাশে ছিল মিলিশিয়া বাহিনীর ক্যাম্প। রেলপথে যাতায়াতকারী নারীদের ধরে এনে এখানে পৈশাচিক নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ পুঁতে রাখা হতো। কালেমা বলতে না পারা পুরুষদেরও একই পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে।
এই মাটি তাই অন্য সব মাটির মতো নয়।
এখানে ঘুমিয়ে আছে একাত্তরের রক্তাক্ত বেদনামন্থিত ইতিহাস।
দেশের প্রতিটি বধ্যভূমি একেকটি মুক্তিযুদ্ধের দু:সহ স্মারক। একেকটি জাতির বিবেক। আলমডাঙ্গার বধ্যভূমিও তার ব্যতিক্রম নয়।
দীর্ঘ আওয়ামী লীগ শাসনামলে যদি উল্লেখযোগ্য জনহিতকর কাজের তালিকা করা হয়, আলমডাঙ্গা বধ্যভূমি নির্মাণ তার অন্যতম। প্রয়াত সংসদ সদস্য সোলায়মান হক ছেলুন জোয়ার্দারের যে কয়েকটি কাজ তাঁকে মৃত্যুর পরও মানুষের স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রাখবে, চুয়াডাঙ্গার আটকবর ও আলমডাঙ্গার বধ্যভূমি তার মধ্যে অন্যতম।
এই বধ্যভূমিকে ঘিরে ছেলুন জোয়ার্দার পার্ক নির্মাণের উদ্যোগও নিয়েছিলেন। কিন্তু ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই প্রচেষ্টা থেমে গেছে। নির্মিত ত্রিমাত্রিক স্থাপনাটির সর্বত্র এখন অযত্নের ছাপ।
এখানেই এসে প্রশ্নটি রাজনৈতিকও হয়ে ওঠে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জামায়াত-এনসিপির প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের ভূমিকা ইতিহাসে নেতিবাচকভাবে চিহ্নিত। ফলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের প্রতি অর্ন্তরবর্তীকালীন সরকারের রাজনৈতিক অনীহা থাকবে—এমন আশঙ্কা অনেকের মধ্যেই ছিল।
কিন্তু এখন তো স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি ক্ষমতায়।
তাহলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলো এখনও এমন অনাদরে পড়ে থাকবে কেন?
প্রশ্নটি শুধু রাজনৈতিক দলের দিকে ছুড়ে দিলে হয়তো উত্তর অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কারণ আলমডাঙ্গার এই স্থাপনাগুলোর প্রতি উদাসীনতার ইতিহাস আরও পুরোনো।
পৌরসভায় কখনও চেয়ারম্যান, কখনও মেয়র হিসেবে অনেকে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁদের অনেকেই পূর্বসূরিদের সুকীর্তির দিকে ফিরে তাকাননি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য, পরমতসহিষ্ণুতার অভাব কিংবা পরশ্রীকাতরতা—কারণ যা-ই হোক, একজনের হাতে গড়া ভালো কাজ যেন পরেরজনের কাছে ভালো কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়নি, প্রতিপক্ষের গর্ব হিসেবে সেটিকে অবহেলা করেছেন।
এটি কেবল রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা নয়; এটি ইতিহাসের প্রতিও এক ধরনের ঔদাসীন্য।
তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন।
দীর্ঘদিন ধরে আলমডাঙ্গা পৌরসভায় নির্বাচিত মেয়র নেই। পৌরসভা পরিচালিত হচ্ছে পৌর প্রশাসনের মাধ্যমে। ফলে পুরোনো রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশের দায় দেখিয়ে এখন আর প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তাহলে পৌর প্রশাসন কেন আলমডাঙ্গার এই অনন্য স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে উদ্যোগী হচ্ছে না?
কুমার নদের ঘাটটি কি ভেঙে পড়ার পর সংস্কার হবে?
শহীদমিনার কি একেবারে হতশী হয়ে যাওয়ার পর নজরে পড়বে?
স্বাধীনতা স্তম্ভ কি পুরোপুরি বিবর্ণ হয়ে যাওয়ার পর তার দিকে তাকানো হবে?
আর বধ্যভূমি—যেখানে একাত্তরের শহীদদের স্মৃতি ঘুমিয়ে আছে—সেটিও কি অযত্নের ভারে একদিন মাটির কোলে লুটিয়ে পড়বে?
একটি শহর শুধু নতুন রাস্তা, ড্রেন আর ভবন দিয়ে বড় হয় না। একটি শহর বড় হয় যখন সে তার অতীতকে সম্মান করতে শেখে। পূর্বসূরির ভালো কাজকে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে নিজের সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করে।
এম সবেদ আলী নেই। মীর মহি উদ্দীন নেই। সোলায়মান হক ছেলুন জোয়ার্দারও নেই। তাঁদের রাজনৈতিক সময়ও এক নয়। কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া স্থাপনাগুলো এখনও আলমডাঙ্গার মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে।
সেগুলি কারও দলীয় সম্পত্তি নয়, আলমডাঙ্গার সম্পদ।
আর আলমডাঙ্গার এই গর্বগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও শেষ পর্যন্ত আলমডাঙ্গাবাসীরই।
নইলে একদিন কুমার নদের ঘাট থাকবে না, থাকবে না শহীদমিনারের পূর্ণ অবয়ব; স্বাধীনতা স্তম্ভের অক্ষর মুছে গেছে, একদিন মুছে যাবে তার উজ্জ্বল স্মৃতিও। বধ্যভূমির স্মৃতিও হারাবে তার দৃশ্যমান চিহ্ন।
তখন ইতিহাস হয়তো বইয়ের পাতায় থাকবে।
কিন্তু শহরটি তার নিজের ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে অপরাধবোধের এক দীর্ঘ কালো অপচ্ছায়া নিয়ে।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
আলমডাঙ্গায় ফিরোজা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও লোকমান হোসেন প্রাইভেট হাসপাতালে ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা : দুইটি ক্লিনিকের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ
১০ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব
১০ ঘন্টা আগে
দামুড়হুদায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আ.লীগ নেতা মামুন গ্রেপ্তার
১৩ ঘন্টা আগে