শীতে ছেঁড়া কম্বলে তিন সন্তান, নির্ঘুম রাত কাটে বিলকিসের

শীতের তীব্রতা বাড়লে তিন সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়ে যায় বিলকিস আক্তারের। জরাজীর্ণ টিনের ঘরের ফুটো দিয়ে হিমেল বাতাস যখন ভেতরে ঢোকে, তখন মেঝেতে বিছানো খড়ের ওপর গা ঘেঁষাঘেষি করে শুয়ে থাকে তিন শিশু। তাদের শরীরে দেওয়ার মতো আছে মাত্র একটি ছিঁড়ে যাওয়া কম্বল। সেই কম্বল দিয়ে সন্তানদের শরীর ঢেকে দিয়ে রাতভর পাশে বসে থাকেন মা। সন্তানদের শীতের কাঁপুনি আর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে শুনতে তাঁর রাত পার হয় ভোরের অপেক্ষায়।
ঠাকুরগাঁওয়ের এই পরিবারের দুই সন্তানই শারীরিক প্রতিবন্ধী। স্বামী বেঁচে থাকলেও তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম হওয়ায় সংসারের পুরো ভার বিলকিস আক্তারের কাঁধে। নুন আনতে পান্তা ফুরানো এই সংসারে চিকিৎসার খরচ জোটানো তো দূরের কথা, ঠিকমতো খাবারও জোটে না। দিনের পর দিন সন্তানদের সাদা ভাত খাইয়ে কোনোমতে দিন পার করছেন তিনি।
বিলকিস আক্তার তাঁর যন্ত্রণার কথা জানিয়ে বলেন, "দুইটা বাচ্চা প্রতিবন্ধী, শীত একদম সহ্য করতে পারে না। রাতে কাঁপতে থাকে। আমার তো করার কিছু নেই, পাশে বসে চোখের পানি ফেলি। সাহায্য না পাইলে আমাদের বাঁচার উপায় নেই।"
স্থানীয় বাসিন্দারা বিলকিস আক্তারের এই লড়াইকে প্রশাসনের অবহেলা হিসেবেই দেখছেন। প্রতিবেশী রেজাউল ইসলাম ও নুর আলমের অভিযোগ, এলাকায় শীতবস্ত্র বিতরণ করা হলেও এমন অসহায় পরিবারগুলো বরাবরই বাদ পড়ে যায়। বিষয়গুলো স্থানীয়ভাবে জানানো হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। রাশিদা বেগম নামে গ্রামের আরেক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, "একজন মা সারারাত সন্তানদের পাশে বসে থাকে, এটা যদি প্রশাসনের চোখে না পড়ে, তবে তারা আর কী দেখবে?"
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল লতিফ। তিনি বলেন, সরকারিভাবে শীতবস্ত্র ও প্রতিবন্ধী ভাতার বরাদ্দ থাকলেও প্রকৃত ভুক্তভোগীরা তা পাচ্ছে না। এটি প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতার অভাব। এসব পরিবারকে খুঁজে বের করে সহায়তা দেওয়া প্রশাসনের করুণা নয়, বরং রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. খাইরুল ইসলাম জানান, পরিবারটির কথা জানার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, "পরিবারটি সত্যিই খুব অসহায়। দ্রুত তাদের শীতবস্ত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কেন তারা এত দিন সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল, তা তদন্ত করে দেখা হবে।"












