৮ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আলমডাঙ্গায় ১ মাসে উদ্ধার ১৬ মোটরসাইকেল: মোটরসাইকেল চোরদের গোপন ঘাঁটি ভাঙল পুলিশ

প্রতিনিধি :
শরিফুল ইসলাম রোকন
আপডেট :
ডিসেম্বর ৫, ২০২৫
498
বার খবরটি পড়া হয়েছে
শেয়ার :
ছবি : 

আলমডাঙ্গার রাতের অন্ধকারে যে চোরচক্র নীরবে ভয়ের ছায়া ছড়াচ্ছিল, এমন কী দিনের আলোতেও ছিল বেপরোয়া। সেই অন্ধকার এবার ছিন্নভিন্ন। মাসব্যাপী বিশেষ ও পরিকল্পিত অভিযানে আলমডাঙ্গা থানা পুলিশ চুরি যাওয়া ১৬টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে। এই অভিযানে বড় ধাক্কা খেয়েছে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা সংঘবদ্ধ মোটরসাইকেল চোর সিন্ডিকেট।

এই সফল অভিযানের নেতৃত্ব দেন আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ মাসুদুর রহমান–পিপিএম। তাঁর সাহসী সিদ্ধান্ত, কৌশলী পরিকল্পনা ও টিমের নিরলস পরিশ্রমেই সম্ভব হয়েছে এই বড় সাফল্য। স্থানীয়রা বলছেন—এই অভিযান শুধু মোটরসাইকেল  উদ্ধার নয়, এটি মানুষের মনে ভরসাও ফিরিয়ে এনেছে।

চুরির একটি ঘটনা থেকেই ভেঙে পড়ে পুরো চক্র: এই অভিযানের সূত্রপাত হয় গত ৩১ অক্টোবর। আলমডাঙ্গার হাটবোয়ালিয়া এলাকায় জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের অফিসার শামীম হোসেনের হিরো স্পেলেন্ডার মোটরসাইকেলটি সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অফিসের বারান্দা থেকে চুরি হয়। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে নামে পুলিশ।

সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে দ্রুত শনাক্ত করা হয় বক্সীপুর গ্রামের সাগর আলী (২১) ও মিরপুর উপজেলার নয়ন আলী (২৬)-কে। তাদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। পরে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সাগর আলী চোরচক্রের গোপন অনেক তথ্য পুলিশের কাছে স্বীকার করে। তার দেওয়া তথ্যই পুরো সিন্ডিকেট ভাঙার পথ খুলে দেয়।

একের পর এক উদ্ধার—চোরদের সাহস ভেঙে চুরমার: সাগরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওসি মাসুদুর রহমান–পিপিএমের সরাসরি নেতৃত্বে এসআই বাবলু খাঁন, এএসআই রাসেল তালুকদার, এএসআই রোকন উদ্দিন, আসাদুল হকসহ পুলিশের একাধিক দল মাঠে নামে।

১৪ নভেম্বর আলমডাঙ্গা স্টেশন এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয় ৫টি মোটরসাইকেল— ডিসকভার ১১০, ডাইয়াং ৮০, হোন্ডা সিভি সাইন, ডিসকভার ১০০ ও টিভিএস মেট্রো।

২ ডিসেম্বর বক্সীপুর এলাকা থেকে উদ্ধার হয় আরও ৫টি বাইক— হিরো এইচএফ ডিলাক্স, দুটি ডিসকভার ১২৫, হোন্ডা ড্রিম নিও ও হিরো স্পেলেন্ডার।

৩ ডিসেম্বর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার হয় আরও ৫টি মোটরসাইকেল— পালসার ১৫০, ডিসকভার ১২৫, সুজুকি ১৫০ এবং দুটি অ্যাপাচি আরটিআর ১৬০।

সব মিলিয়ে মাসব্যাপী অভিযানে মোট ১৬টি চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার করে আলমডাঙ্গা থানা পুলিশ।

চোরচক্রের ভয়ংকর গঠন: অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আলমডাঙ্গা ও আশপাশের এলাকায় ৫ জন ডিলারের অধীনে প্রায় ২০ জন চোর সক্রিয় ছিল। চোর ও ডিলার—দু’পক্ষই বেশিরভাগই গ্যারেজ ব্যবসার আড়ালে এই অপরাধ চালাত। চোরদের বয়স সাধারণত ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। তারা দ্রুত বাইক চুরি করে ৫–১০ মিনিটের মধ্যে নম্বর প্লেট বদলে ফেলত।

শহরে পুলিশের নজরদারি বাড়ায় তারা পাশের উপজেলা—গাংনী, মিরপুর, পোড়াদহ ও কুষ্টিয়া সদর এলাকায় তাদের কাজ ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশের তীক্ষ্ণ নজর এড়াতে পারেনি এই সিন্ডিকেট।

এই প্রসঙ্গে আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ মাসুদুর রহমান–পিপিএম বলেন,

“চোরচক্র যেখানেই লুকাক না কেন, আমরা তাদের বের করবই। আমাদের লক্ষ্য শুধু বাইক উদ্ধার নয়—ডিলারসহ পুরো চক্র ভেঙে দেওয়া। আলমডাঙ্গার মানুষ যেন আগামী ৫ বছর নিশ্চিন্তে থাকতে পারে, সেটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”

পুলিশের প্রশংসায় মুখর আলমডাঙ্গা: এই অভিযানের পর আলমডাঙ্গার বাজার, গ্যারেজ ও পাড়াগুলোতে পুলিশের ভূয়সী প্রশংসা শোনা যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন—আগের মতো রাতে বাইক চুরির আতঙ্ক এখন আর নেই। সাধারণ মানুষের চোখে ওসি মাসুদুর রহমান–পিপিএম এখন সাহসী ও নির্ভরতার প্রতীক।

আলমডাঙ্গায় পুলিশের এই অভিযান শুধু একটি সাফল্য নয়, এটি একটি শক্ত বার্তা—অপরাধ যত বড়ই হোক, আইনের হাত তার চেয়েও শক্ত। ১৬টি মোটরসাইকেল উদ্ধার, চোর গ্রেপ্তার ও নেটওয়ার্ক চিহ্নিত হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে—অন্ধকার যত গভীর হোক, আলোর পথ ঠিকই তৈরি হয়।

প্রশাসন আন্তরিক হলে অপরাধচক্র ভেঙ্গে পড়বেই।

সর্বশেষ খবর
menu-circlecross-circle linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram