গুজব বনাম বাস্তবতা: ‘চিকেনস নেকে’ ৬০ কিমি নিয়ন্ত্রণ ভারতের

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগস্থল 'চিকেনস নেক' বা শিলিগুড়ি করিডোরকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি একটি বিস্ফোরক ও চাঞ্চল্যকর খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। খবরটির সারমর্ম ছিল—ভারতীয় সেনাবাহিনী নাকি এক 'অবিশ্বাস্য পদক্ষেপে' প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকার নিয়ন্ত্রণ নীরবে নিজেদের দখলে নিয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
তবে কূটনৈতিক, সামরিক ও সংবাদ সংস্থাগুলোর গভীর অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়েছে যে, এই দাবিটি সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচারিত একটি 'ফেক নিউজ'।
- ভৌগোলিক অসঙ্গতি: এই খবরটিকে মিথ্যা প্রমাণের জন্য সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো এর ভৌগোলিক তথ্য। শিলিগুড়ি করিডোরের মোট দৈর্ঘ্যই ৬০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। এই সংকীর্ণ করিডোরে অতিরিক্ত ৬০ কিলোমিটার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবিটি অযৌক্তিক এবং অসম্ভব। সীমান্ত বিশেষজ্ঞরা এটিকে 'হাস্যকর' বলে অভিহিত করেছেন।
- সীমান্ত চুক্তির লঙ্ঘন: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে যে সুসংহত সীমান্ত কাঠামো ও প্রোটোকল কার্যকর আছে, তা লঙ্ঘন করে এত বড় মাপের সামরিক নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ঘোর বিরোধী। ২০১৬ সালে ছিটমহল বিনিময়ের পর এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই।
- রহস্যময় নীরবতা নয়, তথ্যের অভাব: খবরটিতে ঢাকা ও নয়াদিল্লির 'কৌশলগত নীরবতা' নিয়ে যে জল্পনা সৃষ্টি করা হয়েছে, তা আসলে খবরটির অস্তিত্বহীনতাকেই প্রমাণ করে। এমন একটি নজিরবিহীন ঘটনা ঘটলে দুই দেশের সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক চ্যানেলে অবশ্যই আলোচনা হতো। এই নীরবতা আসলে গুজবটি নিয়ে তাদের মনোযোগ না দেওয়ার ইঙ্গিত।
- পাকিস্তান যোগের রহস্য: ইউনুস মোল্লা ও পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তার 'মানচিত্র বিনিময়'-এর যে রহস্যময় তত্ত্ব এই গুজবে যোগ করা হয়েছে, তা হলো কেবলই গল্পটিকে বিশ্বাসযোগ্য ও সংবেদনশীল করে তোলার একটি কৌশল। কোনো নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা সংস্থা এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
- উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার: বিশ্লেষকদের ধারণা, ভারতে শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা জোরদার বা সামরিক মহড়ার মতো আসল খবরগুলিকে বিকৃত করে এই '৬০ কিমি নিয়ন্ত্রণ'-এর মিথ্যা খবর ছড়ানো হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করা।
- বাংলাদেশের অবস্থান: শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে 'ভূখণ্ড হারানোর' কোনো প্রশ্নই ওঠে না, কারণ এটি সীমান্ত স্থিতাবস্থার লঙ্ঘন। এই গুজবটি শুধুমাত্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করার একটি ষড়যন্ত্রমূলক প্রয়াস হতে পারে।
সুতরাং, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সকল নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, 'চিকেনস নেক'-এর ৬০ কিলোমিটার এলাকা ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার খবরটি একটি বানোয়াট গল্প। পাঠক সমাজকে অনুরোধ করা হচ্ছে, সংবেদনশীল তথ্য যাচাইয়ের জন্য সবসময় প্রথম আলোসহ মূলধারার এবং প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর নির্ভর করুন।












