শেরিফা রশীদের মহাপ্রস্থান: আলমডাঙ্গার শিক্ষার আকাশের নক্ষত্রপতন

আলমডাঙ্গা আজ শোকে স্তব্ধ। বাতাস ভারী, মানুষ নির্বাক, শহরের কোলাহল থেমে গেছে যেন। বিদায় নিয়েছেন আলমডাঙ্গা ও কায়েতপাড়ার শিক্ষা ও মানবিকতার দীপ্ত মশালবাহক, আমাদের প্রিয় শিক্ষক, আলোকদাত্রী শেরিফা রশীদ। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)
ঢাকার একটি হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় চিকিৎসাধীন থেকে অবশেষে বুধবার বেলা ১২ টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই পুরো আলমডাঙ্গা শহর যেন এক শোকবিহ্বল জনপদে রূপ নেয়। চোখের জল আর স্মৃতির ভারে নুয়ে পড়েন প্রাক্তন শিক্ষার্থী, সহকর্মী, প্রতিবেশী ও শুভানুধ্যায়ীরা। শেরিফা রশীদ আর নেই—এই সত্যটা যেন কেউ মেনে নিতে পারছে না।
শেরিফা রশীদ শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক জীবনদায়ী আলো, এক মানবিক প্রেরণার প্রতীক। প্রাক্তন সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ কৃষকলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ব্যারিস্টার বাদল রশীদের সহধর্মিণী হিসেবে তিনি শিক্ষা ও সামাজিক জাগরণে হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য নাম।
রাজশাহীর অভিজাত পরিবারে জন্ম নেয়া শেরিফা রশীদ ১৯৬৭ সালে এমএ পাস করে আলোকিত সমাজ গঠনের ব্রত নিয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। তার সৌন্দর্য যেমন ছিল বাহ্যিক, তেমনি ছিল তার অন্তরের অপরূপ দীপ্তি। প্রমিত বাংলায় স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতেন, যা শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যেত। কিন্তু তার প্রকৃত শক্তি ছিল জ্ঞানের প্রতি অঙ্গীকার, মানবিকতা ও নৈতিকতায় অবিচল থাকার সাহস।
কায়েতপাড়ার অশিক্ষা ও কুসংস্কারের অন্ধকারে তিনি ও তার জীবনসঙ্গী ব্যারিস্টার বাদল রশীদ হাতে ধরেন শিক্ষার মশাল। তারা প্রতিষ্ঠা করেন কায়েতপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, যেখানে শেরিফা রশীদ নিজেই শিক্ষকতা করে সমাজের নারীদের জীবন বদলে দেন। এই বিদ্যালয় হয়ে ওঠে একটি আলোকিত ভবিষ্যতের কারখানা, যেখানে প্রতিটি পাঠ ছিল মানবিকতার পাঠ, প্রতিটি দৃষ্টি ছিল আশার বাণী।
পরে তিনি যোগ দেন আলমডাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে। সেখানে তার কোমল অথচ দৃঢ় হাতে গড়া শত শত শিক্ষার্থী আজ সমাজের বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলায় তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু পাঠ্যপুস্তক নয়, শেখাতেন জীবন, মূল্যবোধ আর আত্মমর্যাদার পাঠ।
জানাযা শেষে বাদ এশা আলমডাঙ্গা দারুস সালাম কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়। শহরের সর্বস্তরের মানুষ ছুটে যান শেষ বিদায়ে৷ জানাযায় অংশ নিতে। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে প্রবীণ, সবাই দাঁড়িয়ে থাকেন তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।
শেরিফা রশীদ শারীরিকভাবে চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তার শিক্ষার আলো, মানবিক দ্যুতি এবং নৈতিক শিক্ষা চিরকাল জ্বলবে কায়েতপাড়া থেকে আলমডাঙ্গা হয়ে সমগ্র সমাজে।
মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে পরিবারের পক্ষ থেকে একমাত্র পুত্র সন্তান আলমডাঙ্গা সরকারি কলেজের প্রভাষক তাপস রশীদ সকলের নিকট দু আ চেয়েছেন।












