সাম্প্রতিক

সকলের ঘরে ঈদ থাকলেও কৃষকের ঘরে ঈদ নেই!

ধানের দাম কম হওয়ায় রংপুরের বদরগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় কৃষকের মনে আনন্দ নেই। সে কারণে এবার তাঁদের পরিবারেও ‘ঈদ’ নেই। হাতে টাকা না থাকায় এসব পরিবারের সদস্যরা কেনাকাটা করতে পারছেন না।

বদরগঞ্জের তালুক দামোদরপুর গ্রামের কৃষক আতাউর রহমান বলেন, ‘এবার ঈদ মানে হামার ঘাড়োত বোঝা। এক বিঘা (৬০ শতক) ভুঁইয়ে ধান পাচি ৪৫ মণ (প্রতিমণ ২৮ কেজি)। তাক ৩০০ টাকা মণ দরে বেচেয়া পাচি ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। ১৫ হাজার ঋণ নিয়া আবাদ করচি। আবাদ করতে খরচে হইচে ১৯ হাজার টাকা। হামার কি ঈদ আচে?’

আমরুলবাড়ি গ্রামের ইউনুছ আলীর মুখেও একই কথা। ‘হামার এবার ঈদ-ফিদ নাই। বাঁচমো কেমন করি, সেই চিন্তায় ঘুমবার পাওচি না। হামরা তো চাকরি করি না। আবাদ করি ধান বেচেয়া সউগ খরচ কইরবার নাগে। এবার ধান বেচেয়া খরচে ওঠোচে না। ছইল দুইটা ঈদোত স্যুট (ফুল প্যান্ট) কিনি চাওচে, কান্দোচে। তাক শুনিয়া ছইলের মাও বকবকাওচে। বাজারোত গেচনু দুইটা স্যুটে দাম চাইচে বারো শ টাকা। সাত শ টাকা দাম করচু দেয় নাই। ঘুরি আলচু। এবার এক কেজি গরুর গোশত ৫০০ টাকা দিয়া কিনার খেমতা নাই।’

এই উপজেলার উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় বলেন, বদরগঞ্জে কৃষকের সংখ্যা ৬২ হাজার ৫৩৭ জন। বর্তমানে বাজারে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ উঠছে না। এই অবস্থায় ঈদ সন্নিকটে হওয়ায় কৃষকেরা বেকায়দায় পড়েছেন।

রামনাথপুর এলাকার কৃষক মোখলেছার রহমান বলেন, ‘ঈদ চাকরিয়ার ঘরে। কেষকের জন্যে নোয়ায়। চাকরিয়ার বেতন বাড়োওচে আর কেষকের ধানের দাম কমোওচে।’

আমরুলবাড়ি গ্রামের আবদুল কুদ্দুস সরকার বলেন, ‘ঈদের দিনটা তাড়াতাড়ি পার হয়া গেইলে বাঁচি। বউ-ছইল পইল সবায় আশা করি আছে। টাকা নাই। মুই কাপড় কিনিম কী দিয়া!’

বদরগঞ্জ বাজারের তৈরি পোশাক বিক্রেতা সোহেল রানা বলেন, কৃষকেরা এবারে কেনাকাটামুখী না হওয়ায় ঈদের বাজার জমছে না।’

জানতে চাইলে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম বলেন, এবারে ধানের দাম না পাওয়ায় কৃষক পরিবার–পরিজন নিয়ে বাঁচা–মরার লড়াইয়ে পড়েছেন। এই অবস্থায় অনেক কৃষকের ঘরে ঈদের আনন্দ স্পর্শ করবে না।

এবার ধানের ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম নেই। বাজারে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচই উঠছে না।

এদিকে ঠাকুরগাঁওয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাপড়ের ব্যবসাকেন্দ্র পীরগঞ্জ পৌর শহরের কাপড়পট্টির বিপণিবিতানগুলোয় এখনো ক্রেতাদের তেমন ভিড় দেখা যাচ্ছে না। এখানকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, পীরগঞ্জ কৃষিনির্ভর এলাকা। এবার ধানের দাম কম হওয়ায় কৃষকের হাতে তেমন টাকাপয়সা নেই। এ কারণে তাঁরা হয়তো কাপড় কিনতে পারছেন না।

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জসহ রানীশংকৈল ও হরিপুর উপজেলার অনেক মানুষ ঈদ-পূজার সময় পীরগঞ্জ কাপড়পট্টিতে কাপড় কিনতে আসেন। এবার এখনো ক্রেতার খুব অভাব। ফলে বেচাবিক্রি অর্ধেকে নেমেছে।

জিকু নামের দোকানের মালিক নজরুল ইসলাম বলেন, ঈদে কৃষকেরাই দোকানে বেশি খরচ করেন। গত ঈদের সময় প্রতিদিন দুই-আড়াই লাখ টাকার কাপড় বেচতাম। এবার ধানের দাম কম হওয়ায় সপ্তাহেও কৃষকের দেখা নেই। কৃষক নেই, তাই দোকানের বিক্রিও কম।

ইত্যাদি ফ্যাশনের মালিক সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষকদের আশায় মোকাম থেকে অনেক টাকার কাপড় এনেছি। কৃষক না আসার কারণে দিনের বেচাবিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে।’

দৌলতপুর গ্রামের প্রান্তিক কৃষক আব্বাস আলী জানান, বিঘাপ্রতি আট মণ ধান দেওয়ার চুক্তিতে এক কৃষকের এক বিঘায় ব্রি-২৮ ধান আবাদ করে ৩০ মণ ফলন পেয়েছেন। জমির মালিককে ধান বুঝে দেওয়ার পর তাঁর কাছে এখন ২২ মণ ধান আছে। কিন্তু ক্রেতার অভাবে ধান বেচতে পারছেন না। দু-একজন ধান কিনতে চাইলেও প্রতি মণের দাম হাঁকাচ্ছে আড়াই শ টাকা। এ জন্য এক মণ ধানও বেচতে পারেননি তিনি। কয়েক দিন পর ঈদ। হাতে টাকা না থাকায় ঈদের কেনাকাটা করতে পারেননি তিনি।